Share

টপিক: কল্প গল্প নয় সত্যনিষ্ঠকাহিনী [পর্বঃ ০৩]

আগের পর্বগুলি
সত্য পথে যারা হার মানেনা তারা
কায়েস মাহমুদ

হযরত জাবির (রা)!
মহান এক সাহাবী। যেন উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, যা জ্বলতে থাকে জ্বল জ্বল করে।
তেমনি এক সাহাবী ছিলেন হযরত জাবির (রা)।
জাবির যখন রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করছিলেনতখন রাসূল (সা) বলেছিলেন :তোমরা সারা দুনিয়ার মধ্যেউত্তম ব্যক্তি।
এই বাইয়াত সম্পর্কে অন্যান্য সাহাবীরা পরবর্তীকালে বলতেন, আমরা মৃত্যুর ওপর বাইয়াত করেছিলাম।
কিন্তু জাবির বলতেন, আমরা মৃত্যুর ওপর বাইয়াত করিনি। আমরা বাইয়াত করেছিএই কথার ওপর যে, আমরা পালিয়ে যাব না।
সাহাবীরা হুদাইবিয়া থেকে চলা শুরু করেন। পথে সুকইয়া নামক স্থানে যাত্রাবিরতি হয়। সেখানে পানি ছিল না। ছিল না কোনো ভালো ব্যবস্থা।
হযরত মুয়াজ ইবন জাবালের (রা) মুখ দিয়ে ঘোষণা হলোÑকেউ যদি পানি পান করতো।
ঘোষণা শুনে জাবির (রা) কয়েকজন আনসারকে সঙ্গে করেপানির সন্ধানে বের হলেন।
দীর্ঘ তেইশ মাইল দূরে কুরসায়া নামক স্থানে পানির সন্ধান পান। সেখানেথেকে মশকে ভরে পানি আনেন।
এশার নামাজের পর দেখেন, একব্যক্তি উটে সাওয়ার হয়ে হাউজের দিকে যাচ্ছে।
তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে কারীম (সা)।
জাবির (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) উটের লাগাম টেনে ধরে উট বসিয়ে দেন।
রাসূল (সা) নেমে নামায আদায় করেন।
জাবির নিজেও রাসূলের (সা)পাশে দাঁড়িয়ে নামাযে শরিকহন।
হিজরি ৪০ সনে আমীর মুয়াবিয়ার গভর্নর (আমির) বসুর ইবন আরতাত হিজায ও ইয়েমেনে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আসেন এবংমদীনায় এক ভাষণ দান করেন।ভাষণে তিনি বলেন, যতক্ষণ জাবির আমার সামনে হাজির না হবে ততক্ষণ বনু সালামাকে আমান বা নিরাপত্তা দেয়া হবে না।
জাবির (রা) জীবনের আশঙ্কাকরছিলেন। তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামার (রা) কাছে গিয়ে পরামর্শ করেন।
উম্মু সালামা তাঁকে বলেন, আমি আমার ছেলেদেরকেও বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) করতে বলেছি, তুমিও বাইয়াত করে নাও।
জাবির (রা) বলেন, এটা তো হবে গোমরাহির ওপর বাইয়াত।
উম্মু সালামা বলেন, না, এটা হবে মজবুরী বা বাধ্য অবস্থার বাইয়াত। আমার মত এটাই।
তাঁর পরামর্শ মতো জাবির বসুরের সামনে হাজির হন এবং হযরত আমীর মুয়াবিয়ার খিলাফতের সপক্ষে বাইয়াত করেন।
হিজরি ৭৪ সনে হাজ্জাজ ছিলেন মদীনার গভর্নর। তাঁর জুলুম অত্যাচার থেকেসাহাবীরাও নিরাপদ ছিলেন না। তিনি কিছুসংখ্যক সাহাবীর ওপর এতটুকু করুণাকরেন যে, তাঁদের ঘাড়ে, আর জাবিরের হাতে সিল মোহর মেরে দেন।
শেষ জীবনে জাবির বলতেন, আমি আকাবায় উপস্থিত ছিলাম। হাজ্জাজ ও তার কর্মকাণ্ডও প্রত্যক্ষ করেছি। আমার চোখের মত কানদু’টিও যদি নষ্ট হয়ে যেত, কতই না ভালো হতো! তাহলে অনেক কিছুই আমাকে আর শুনতে হতো না।
কী আফসোসের কথা!
হযরত জাবির শেষ জীবনে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন।চোখেও দেখতেন না। তার ওপরসরকারের জুলুম অত্যাচার তাঁকে আরও কাহিল করে ফেলে।
তাঁর মৃত্যু সন হিজরি ৭৮, ৭৭, ৭৪ অথবা ৭৩ বলা হয়েছে।তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরি ৭৮ সনে ৯৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
তিনি ছিলেন তৃতীয় আকাবায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদেরমধ্যে সর্বশেষ দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণকারী সাহাবী।
জাবির ছিলেন মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি। তৃতীয় আকাবায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে এ সময় পর্যন্ত একমাত্র জাবিরই জীবিত ছিলেন। আর সাহাবীদের যুগও তখন শেষ হতে চলেছিল। অল্প সংখ্যক সাহাবী জীবিত ছিলেন। এই কারণে তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর জন্য তাঁর অস্তিত্ব ছিল রহমত ও বরকতস্বরূপ।
হাজ্জাজের জুলুম অত্যাচার তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং নিজেও সহ্য করেছিলেন। তাই মৃত্যুর পূর্বে অসিয়ত করে যান যে, হাজ্জাজ যেন তাঁর জানাযারনামায না পড়ায়।
সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কারও প্রভাব-প্রতিপত্তি জাবিরকে (রা) কক্ষনো বিরতরাখতে অথবা বিপথগামী করতেসক্ষম হয়নি।
হযরত সাদ ইবন মুয়াজ (রা) ছিলেন আউস গোত্রের নেতা। তাছাড়া একজন উঁচু মর্যাদার সাহাবী। তিনি ইন্তেকাল করলে হযরত রাসূলে কারীম (সা) বললেন :আজ আরশ কেঁপে উঠেছে!
হযরত জাবির ছিলেন এমনই একমর্যাদাবান সাহাবী। তিনি সত্য ও স্পষ্টভাষী।
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ মদীনারগভর্নর হয়ে আসার পর নামাযের সময়ে কিছু আগে-পিছে করেন।
লোকেরা জাবিরের কাছে ছুটেআসে। তিনি ঘোষণা করেন, রাসূল (সা) জোহরের নামায দুপুরের পরে, আসর সূর্য স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল থাকা পর্যন্ত, সূর্যাস্তের সময়মাগরিব ও ফজরের নামায অন্ধকারে আদায় করতেন। আর এশার সময় লোকদের জন্য অপেক্ষা করতেন। তাড়াতাড়ি লোক সমাগম হলে তিনি তাড়াতাড়ি আদায় করতেন। অন্যথায় দেরি করতেন।
একবার আবদুল্লাহ ইবন জাবির তাঁর বাগানে ফল তিনবছরের জন্য বিক্রি করেন। জাবির (রা) এ কথা জানতে পেরে কিছু লোক সঙ্গে করে মসজিদে আসেন এবং সকলের সামনে ঘোষণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এমন ধরনের বেচা-কেনা নিষেধ করেছেন। ফল যতক্ষণ খাওয়ারউপযোগী না হয় ততক্ষণ তা বেচা-কেনা জায়েয নয়।
রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণের আবেগ-উৎসাহ তাঁর মধ্যে এত প্রবল ছিল যে, যে সকল বিষয়ে অনুসরণ আদৌ প্রয়োজনীয় নয়, সে ক্ষেত্রেও তিনি অনুসরণ করতেন।
একবার রাসূলুল্লাহকে (সা)মাত্র একখানা কাপড়ে নামাযআদায় করতে দেখেন হযরত জাবির (রা)। এ কারণে তিনিও সেইভাবে নামায আদায়করলেন। লোকেরা যখন বললো আপনি এভাবে নামায আদায় করলেন, অথচ আপনার নিকট অতিরিক্ত কাপড় আছে।
তিনি বললেন, এটা এই জন্য করলাম যে, তোমরা রাসূলুল্লাহর (সা) এই অনুমতিকে দেখে বুঝতে পার।
হযরত রাসূলে কারীম (সা) মসজিদে ফাতহ-এ তিন দিন দু’আ করেছিলেন।
তৃতীয় দিন নামাযের মধ্যে দু’আ কবুল হলে তাঁর চেহারামুবারকে এক প্রকার নূরের চমক খেলে যায়।
হযরত জাবির এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই যখনই তিনি কোন বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতেন, একটা নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে গিয়ে দু’আ করতেন।
রাসূলের (সা) এমনই অনুসারী ছিলেন হযরত জাবির(রা)।
তিনি ছিলেন সত্য সাহসের উজ্জ্বল প্রতীক। এজন্যই তিনি দুনিয়া ও আখিরাতকে জয় করতে পেরেছিলেন। সফল করতে পেরেছিলেন তার জীবন।
মূলত সত্য পথে থাকে যারা হার মানে না তারা।
হযরত জাবিরই (রা) তার দৃষ্টান্ত।
এমন জীবনইতো আমাদের কাম্যহওয়া উচিত!

ফোরামে আছি ।