Share

টপিক: কল্প গল্প নয় সত্যনিষ্ঠকাহিনী [পর্বঃ ০৪]

আগের পর্বগুলি
দুই ইয়াতীমের র“ধির
(আরশাদুল ক্বাদেরী (রহ.)’র লালাঃযার অবলম্বনে)

আজ খান্দানে নবূয়তের সুপ্রিয় আঁখি ও রবি হযরতইমাম মুসলিম (রা.)’র পবিত্র রক্তে কূফার ভূমি রঞ্জিত হয়ে গিয়েছিল। নবীযাদার আগমনের শুভে”ছায় নয়নের গালিচাবিস্তারণকারী জনপথ তাঁর ছট্ফট্রত লাশের সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে।
তরবারীর ধার, বর্শার ফলা ও তীরের নখে এখনও  রক্তচিহৃ মওজুদ। ইবনে যিয়াদের নির্দেশে হযরত ইমাম মুসলিমের লাশ মোবারক রাজপথে টাঙ্গিয়েদেওয়া হয়েছে। কয়দিন ধরেই লটকানো আছে আর নবী (দ.)’র কলেমা পড়–য়ারা খোলা চোখে এ ভয়াবহ দৃশ্যদেখতে আছে। আলে রাসূলের প্রাণ নিয়েও তাদের পিপাসা মিটলনা! হায়রে অদ্ভুত জগৎ! ভূ ও নভোমণ্ডলের বিস্তীর্ণ বিস্তৃতি যে ঘরের মালিকানাধীন ছিল, আজ তাঁরই কবরের জন্য কূফার ভূমিতে সাড়ে তিন হাত জায়গা মিলছেনা!
যার দয়ার প্রাচুর্যে ঈমানদারদের প্রাণের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল, আজ তারই নয়নমণির রক্ত সস্তা হয়ে গিয়েছে! লজ্জায় সূর্য মুখ লুকিয়েছে। জগৎ শোকের কাল চাদরে আ”ছাদিত। সন্ধ্যা হতেই সমস্ত কূফা ভয়ানক আঁধারে ডুবে গেল। অতিথির সাথে প্রতারণা কূফাবাসীদের ক্ষেত্রে মহাপ্রলয় পর্যন্তের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
নিষ্ঠরতার শেষ এখানেও হয়নি। জুলুম অত্যাচারেরজনপথে দুর্ভাগ্যের ঘন আঁধার আরো বাড়তে রইল।
রাতের নীরবতায় হঠাৎ ইবনে যিয়াদের কুশাসনের এক ঘোষক ঘোষণা দিল, “মুসলিমের দুই শিশু, যারাসঙ্গে এসেছিল; কোথাও আত্মগোপন করেছে। সরকারেরপক্ষ থেকে সাধারণ-অসাধারণ সকলকে সতর্ক করা হ”েছ যে, যে ব্যক্তিই তাদের আশ্রয় দেবে, তাকে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দেওয়া হবে। আর যে গ্রেফতার করে আনবে, তাকে রাজপুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত করা হবে।”
হযরত ইমাম মুসলিমের দুই শিশু মুহাম্মদ (৮) ও ইব্রাহীম (৬) কূফার প্রসিদ্ধ আশেকে রাসূল কাজী শুরায়হ এর ঘরে আশ্রিত ছিল। এ ঘোষণা শুনেকাজী শুরায়হ এর কলিজা কেঁপে ওঠল।
হযরত ইমাম মুসলিমের কলিজার টুকরোদের পরিণতি চোখের সামনে নগ্ন নৃত্য করছে। বহুক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করতে রইল যে, কী করে জালেমের থাবা থেকে তাঁদের রক্ষ করা যায়!
বহু চিন্তা-ভাবনার পর রাতারাতি দুই শিশুকে কূফার জমিন হতে বাইরে পৌঁছানোর মাধ্যমে রক্ষা করা যেতে পারে বলে ধারণা হলে অতি অ¯ি’রতায় নিজ পুত্রকে ডাক দিলেন। ছেলেকে চুপি-চুপি বললেন, ‘অতি সাবধানতায় কোন নিরাপদ পথে শিশু দু’টিকে কূফার বাইরে পৌঁছে দাও। রাতে মদীনার দিকে গমনকারী কাফেলা জনবসতির নিকট দিয়ে যা”েছ; যে কোনউপায়ে তাদের সঙ্গে মিশিয়ে দাও’।
পথসম্বল যোগাড়ের পর বিদায় দেওয়ার জন্য দুই শিশুকে নিকটে ডেকে নিলেন। তাঁদের প্রতি দৃষ্টি পড়তেই দু'চোখ ভিজে ওঠল। দুঃখ-শোকে ধৈর্যের বাঁধন ভেঙে পড়ল। মুখ হতে এক চিৎকার বের“ল আর দুই শিশুকে বুকেজড়িয়ে নিল। লালাটে চুম্বন দিল, মাথায় হাত রাখল এবং মূর্ছিত অব¯’ায়বহুক্ষণ র“দ্ধশ্বাস রইল।
পিতার শাহাদত সম্পর্কে দুই শিশুকে এতক্ষণ পর্যন্ত বেখবর রাখা হয়েছিল। এ সংবাদও তাঁদের দেওয়া হয়নি যে, এখন স্বয়ং তাঁদের কচি গর্দনও রক্তপিপাসু তরবারীর টার্গেটে রয়েছে।
কাযী শুরায়হ এর এমন আচরণে শিশুদ্বয় আশ্চর্যহয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। বড়ভাই হতচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমাদের দেখে ব্যাকুল ক্রন্দনের কারণ বুঝে আসছেনা! এত রাতে ডেকে হঠাৎ আমাদের শিরে স্নেহমাখা হাত চঞ্চালন অহেতুক নয়। এ রূপ  হৃদয়গলা সমবেদনাতো আমাদের খান্দানে ইয়াতিমদের জ্ঞাপন করা হয়”।
তীক্ষè শরের ন্যায় হৃদয়বিদারক এ বাক্য শেষ হতে-না হতে আরেকটি বিকট শব্দে ফের ধরণী প্রকম্পিত হল। কাযী শুরায়হ বর্ষণমুখর  চোখে বাকর“দ্ধপ্রায় উত্তর দিলেন,
‘গুলশানে রসুলের ফুটন্ত কলি! কলিজা ছিঁড়ে মুখে আসতে চাইছে, মুখে বলার ভাষা নাই। কী করে সংবাদ দিই যে, বাগানের শোভা উজাড় হয়েছে, আপনাদের আশার নীড় দিনদুপুরে জালেমরা লুটে নিয়েছে!
হায়! আপনারা পর দেশে ইয়াতিম হয়ে গিয়েছেন। আপনাদের বাবাকে কূফাবাসীরা শহীদ করে দিয়েছেন, এখন আপনাদের প্রাণও ঝুকিপূর্ণ। আজ সন্ধ্যা হতেই রক্ত পিপাসুরা হন্যে হয়ে আপনাদের খুঁজছে। নগ্ন তরবারী নিয়ে হুকুমতের কুকুররা আপনাদের পিছে লেগেছে।
এ সংবাদ শুনে দুই শিশু ডরে-ভয়ে কাঁপতে লাগল। কচি কলজে ভীত হল। ফুলের সতেজ মুকুল কুঁকড়ে গেল। মুখ হতে বিকট শব্দ বের“ল আর মূর্ছিত হয়ে ভূমিতে পড়ে গেল। হায়রে ললাটের তামাশা! আজ কয়েক দিন মাত্র হল যে, মাতৃ মমতা-স্নেহের শীতল পরশে মদীনা হতে বিদায় দিয়েছিল। আব্দার মেটানোর জন্য পিতৃস্নেহ সঙ্গি ছিল। এখন না বাবার দামান আছে যে, ধরে লেপ্টেযাবো; না মায়ের আঁচল রইলযে, ভয় পেলে মুখ লুকাবো! এখন কাচা ঘুম ভাঙ্গলে তাঁরা কাকে ডাকবে? কে রইলতাঁদের ভেজা পলকের আপন আস্তিনে মুছে নেবে?
হায়! মুকুলের সে কোমল পাপড়ি, যা শিশিরের ভার বইতেও অপারগ; তার ওপর আজ দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়েছে!
পর দেশে পিতার শাহাদতের সংবাদ কচি প্রাণের জন্য কিয়ামতের চেয়ে কি কম ছিল যে, এখন স্বয়ং আপন জানেরও ভয়; ভাগ্য নগ্ন তরবারী হাতে শিরে দাঁড়ানো। চোখের সামনে আশার প্রদীপ নিভছে। শিশুদ্বয়ের আহাজারি ও চিৎপাত ছটফট কাযী শুরায়হ এর সহ্য হলনা। সান্ত্বনার বুলিও মুখে আসছেনা। বড় কষ্টে বললেন, বনু হাশিমের কোমলমতি, এ রূপ ফুঁসে-ফুঁসে কেঁদনা; শত্র“রা দেওয়ালের সাথে কান লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আপনার  আপন মজলুম পিতার স্মারক, তাজেদারে মদীনা (দ.)’র পবিত্র আমানত, কোমলমনের আয়না কোথাও আঘাত পেয়ে গেলে আমি ক্বিয়ামতের দিন মুখ দেখাতে পারবোনা। অতএব মদীনার নিরাপদ নগরী পর্যন্ত আপনাদের  পৌঁছে দেওয়াই আমার একমাত্র প্রচেষ্টা।
এমতাব¯’ায় রাতের নির্জনতায় আপনারা উভয় আমার ছেলের সাথে কূফার বাইরে বেরিয়ে যান এবং যেকাফেলা মদীনার দিকে যা”েছ তাদের সঙ্গে মিলিত হোন। আপন নানাজানের দয়ার প্রতিবেশে পৌঁছে আমার পক্ষ থেকে দুরূদ-সালামের হাদিয়া পেশ করবেন।
“আ”ছা যান, খোদা আপনাদের হেফাযত ও নিরাপদ রাখুন”।
আদ্র নয়নে কাযী শুরায়হ শিশুদ্বয়কে বিদায় দিলেন।

ফোরামে আছি ।

Share

জবাব: কল্প গল্প নয় সত্যনিষ্ঠকাহিনী [পর্বঃ ০৪]

প্রহরী ও গোয়েন্দাদের নজর হতে চুপিয়ে কাযী শুরায়হ এর পুত্র পূর্ণ হেফাজতে তাঁদেরকে কূফার নগর দ্বার পার করে দিলেন। সম্মুখে অনতিদূরে কাফেলার ছায়া দেখা যা”িছল, আঙ্গুলের ইশারায় শিশুদ্বয়কে দেখিয়ে দিল। ইঙ্গিত পেতেই শিশুদ্বয় কাফেলারদিকে দ্র“ত এগোল এবং দৃষ্টি হতে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
রাতের ভয়ার্ত নির্জনতা, ভায়ানক আঁধার, ভয়-ভীতিতে নিমজ্জিত পরিবেশ আর মাতৃকোল হতে সদ্য বিচ্যূত দুই কচি প্রাণ; না হাতে আছে বিবেক-অভিজ্ঞতার দীপ, না সঙ্গে আছে সঙ্গী কোন গাইড, কিছু দুর গিয়েই তাঁরা পথ ভুল্ল।
হায়রে কালের ঘোর বিপাক! কাল পর্যন্ত  যে আদুরেদেরকদমনীচে পুস্পশয্যা ছিল, আজ তাঁদেরই পথে কাঁটার বর্শা-বল্লম খাঁড়া। যারবাবার আঙ্গুলের সাহায্য ছাড়া নানাজানের রওজা পর্যন্ত যেতে পারতেন না, আজ তাঁরা একা-নিঃসঙ্গ ভিন দেশে বিজন প্রান্তরে ঘুরপাক খা”েছ। কখনো অভ্যাস ছিলনা, চলতে-চলতে চিৎপাত হ”েছ, কদমে-কদমে হোঁচট খা”েছ, পা কন্টক হতেই উফ্ করে বসে যেত, বায়ুর  শনশনে ভয়ে কাঁপত, পাতার মর্মর ধ্বনিতে কোমল কলজে সন্ত্রস্ত হত, জীব-জš‘র  শব্দ পেলেই হতচকিত হয়ে একে অপরের সাথে জড়িয়ে যেত, কখনো ভয় পেলে থরথরিয়ে ওঠত ফের চলতে শুর“ করত। কখনো ব্যাকুল হয়ে মাকে স্মরণ করত আবারকখনো আকুল হয়ে বাবাকে ডাকত। কখনো ব্যগ্র হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করত আবার কখনো ছলছল নয়নে আকাশ পানে দেখত।
যতক্ষণ পায়ে চলৎশক্তি ছিল ওই অব¯’াতেই চলতে রইল। অবশেষে নৈরাশ হয়ে এক ¯’ানে বসে পড়ল।
ভাগ্যের পরিহাস দেখুন যে,রাতের শেষ প্রহর ছিল, পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া চাঁদের আলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে। ইবনে যিয়াদের পুলিশ বাহিনীর এক টহলদাতা দল, যারা ওই শিশুদ্বয়ের তালাশে বেরিয়েছিল, তারা ঘুরতে-ঘুরতে ঠিক ওই ¯’ানে এসেই জিজ্ঞাসা করল, “তোমরা কার?”
শিশুরা ইয়াতিমের প্রতি সকলের সাহানুভূতি থাকে মনে করে নিজেদের সমস্ত অব¯’া খুলে  বলে দিল।
হায়রে শৈশবের সারল্য! ওই সরল-সোঝা শিশু কি জানতযে, খুনপিপাসীকেই আপন পরিচিত বলছে।
পরিচয় পাওয়ার পর জল্লাদরা তাঁদের গ্রেফতার করল এবং শক্ত করে বেঁধে টেনে-হেঁচড়ে সাথে নিয়ে চল্ল।
এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য  দেখে ডুবন্ত তারার আঁখিতে পলক পড়ল। চাঁদের মুখ মলিন হল। অসহনীয় কষ্টে আক্বীল তম্বয় মুসলিমের দুই ইয়াতিম শিশু কেঁদে ওঠল। হৃদয় হেলানো ফরিয়াদ সাহরায় গুঞ্জরিত হল।
‘আমরা পিতাহারা শিশু, আমাদের অনাথত্বের প্রতি দয়া কর“ন, রাতভর চলতে-চলতে পায়ে ফোসকা পড়ে গিয়েছে, আমাদের বাধন খুলে দিন। এখন কষ্ট সহ্য করার শক্তি নেই। নানাজানের দোহাই, আমাদের আঘাত চূরচূর দেহের প্রতি একটু মায়া কর“ন। ঘহীন অরণ্যে ইয়াতিমের ফরিয়াদ শুনুন।
এ বেদনা বিধুর ক্রন্দনে যুগের কলজে হেলে গেল, কিš‘পাষাণ পাতকদের একটুও প্রভাবিত করলনা। দয়া-মায়া করার পরিবর্তে জালেমরা  পুস্পাননে থাপ্পড় দিয়েবল্ল , “তোমাদের খুঁজে কয়েক দিন ধরে চোখের নিদ্রা ওড়ে গেল, খানা-পিনা হারাম হয়ে গেল আর তোমরা পলানোর পথ অবলম্বন করে চুপে-চুপে জঙ্গলে ফিরছ। যতক্ষণ তোমরা আপন কর্মফল ভোগ করবেনা, ততক্ষণ তোমাদের প্রতি কোন দয়া করা হবেনা।”
চপোটাঘাতে নূরের চাকে গড়া সুরতে দাগ পড়ে গেল,চেহরায় আঙ্গুলের চিহৃ ফুলে ওঠল।
কাঁদারও অনুমতি ছিলনা যে,হৃদয়ের বোঝা হাল্কা হবে। বন্দি পাখির ন্যায় দীর্ঘশ্বাস ফেলতে-ফেলতে,হাঁফতে-কাঁপতে, মাথা নুয়ে, শিকল পড়ে, পদে-পদে শত্র“দের জুলুম-অত্যাচার চোখ বুজে হজম করতে ছিল।
এখন আশার প্রদীপ নিভে গেল, মনের আশা চুরমার হল, সকলকে ডাকতে-ডাকতে দমে গেল, কোথাও হতে কোন সাহায্যকারীর  উদয় হলনা,অবষেশে কোমলান্তর নৈরাশ্যের অথৈ সাগরে ডুবে গেল।
এখন মৃত্যুর ভায়নক ছায়া দিবসের আলোতে নজরে আস্ছে। অমনি নৈরাশ্যে ধুঁকতে-ধুঁকতে কূফার দিকে অগ্রসর হ”িছল। আপন চাউনিতে পৌঁছে সিপাহীরা ইবনে যিয়াদকে সংবাদ দিল। নির্দেশ হল, জেলখানায় বন্দি করতে এবং দামেশ্ক হতে কোন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত কঠোর প্রহারায় রাখতে।
হুকুমতের সিপাহীরা ইবনে যিয়াদের নির্দেশ মতে উভয় শিশুকে জেলখানার দারগার হস্তান্তর করে চলে গেল। দারগা অতি কোমলান্তর ও আহলে বায়তের প্রতি উৎসর্গপ্রাণ ছিলেন। তিনিঅতি ভক্তি-বিশ্বাসে হাশেমী শাহযাদাদের আরাম-আয়েশের  ব্যব¯’া করলেন।
রাত্রি দ্বিপ্রহর অতিক্রমান্তে তিনি জীবনবাজি রেখে দুই শাহযাদাকে জেল হতে বের করলেন। নিজের হেফাজতে কাদেসিয়ার সড়কে নিয়ে নিজের আংটি দিয়ে আপন ভাইয়ের ঠিকানা জানিয়ে বললেন, কাদেসিয়ায় পৌঁছে আপনারা তার সাথে মিলিত হবেন এবং নিদর্শন স্বরূপ এ আংটি দেখাবেন। পরিপূর্ণ হেফজতে আপনাদেরমদীনায় পৌঁছে দেবে। এ বলে তিনি ছলছল নয়নে শিশুদ্বয়কে বিদায় দিলেন।
কাদেসিয়া অভিমুখে গমনকারী কাফেলা অনতিদূরেপ্র¯‘ত খাঁড়া ছিল। শিশুদ্বয় অ¯ি’র হয়ে ওই দিকে দৌঁড়ে গেল, কিন্তু ললাট-লিখনী এখানেও ফের আপন কারিশমা দেখাল। বিদঘুঁটে অন্ধকারের বুক ছিঁড়ে উঁকি দেওয়া সূর্য আড়াল হল। মদীনার ওই কচি মুসাফিরদের ফের প্রবাস-মর“র দুর্দশা ঘিরে ধরল।
আবার কতদূর গিয়ে পথ হারাল, কাফেলা দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেল। ফের রাতের ওই ভয়ানক নির্জনতা, ওই ভীতিকর আঁধার, ওই গহীন অরণ্য, ওই প্রবাস-সন্ধ্যার ভয়াল স্বপ্ন, চতুর্দিকে রক্ত পিপাসু তরবারীর পাহারা, পদে-পদে ত্রাস। চলতে-চলতে পা অড়াষ্ট, পদতলের ফোসকা ফেটে বইতে লাগল, কাঁদতে-কাঁদতে নয়ন ঝরণা শুকিয়ে গেল।
সকাল হতেই দেখল  যে, যেখান হতে যাত্রা, ঘুরে-ফিেের ওখানেই রয়েছে।
হায়রে ভাগ্যচক্র! এ ধরণীর কীট-পতঙ্গ ও পশু-পাখির নিশী যাপনের নীড় আছে;  কিš‘  খান্দানেনবূয়তের দুই কচি ইয়াতিমের জন্য কোথাও আশ্রয়ের জায়গা নেই!
সকাল হলে চতুর্দিকে মানুষের আসা-যাওয়া শুর“হলতো, গতকালের প্রেফতারের কথা স্মরণে অ¯ি’র হয়ে গেল। শত্র“র দৃষ্টি হতে গোপনের জন্য সব দিকে দৃষ্টি ফেরাল কিš‘ ধু-ধু মর“প্রান্তরে কোন সংরক্ষিত জায়গা মিল্লনা।
হত বিহ্বলতা, অসহায়ত্ব, নৈরাশ্য ও ভয়-ত্রাসে দুই ভাই পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল।
কচি শিশু, কৈশোরের বুদ্ধি, কিছুই বুঝে আসছিলনা যে, কোথা যাবে, কীকরবে! পরিণতি ভাবনায় চোখ ছলছল করে ওঠল।
অনতিদূরে প্রবাহমান ঝরণাছিল। বড় ভাই ছোট্টকে বল্ল,

ফোরামে আছি ।

Share

জবাব: কল্প গল্প নয় সত্যনিষ্ঠকাহিনী [পর্বঃ ০৪]

‘চল ওখানে হাত-মুখ ধোয়ে নিই, ফজরের নামাযের সময়ওহয়েছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে যদি আমাদের শেষ সময়এসে যায়, তবে তা কেউই ঠেকাতে  পারবেনা’।
ঝরণা নিকটে পৌঁছে বহু পুরোনো একটি গাছ দেখতে পেল, যার কান্ড ভিতর থেকেখোল ছিল। আশ্রয়ের জায়গা মনে করে দুই ভাই তাতে লুকিয়ে বসে গেল।
টুকু শব্দ হলেই অন্তর ধড়ফড় করে ওঠত, কোনা পথিক গেলেই শত্র“ মনে করেজড়সড় হয়ে যেত।
বেলা এক প্রহর অতিক্রমান্তে কূফার দিক হতে এক দাসী পানি নেওয়ারজন্য ঝরণাদ্বারে এল। কলস পানিতে ডুবাতেই জলের ওপর মানুষের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল। ফিরে দেখতে পেল কচি দু’টি শিশু কৃক্ষগর্তে জড়সড় হয়ে বসে আছে।
শুভ্র কপাল হতে নূরের কিরণ বি”ছুরিত হ”েছ, রক্তজবার মতো লোহিত আননে খরা মৌসুমের উদাসভাব ছেয়ে আছে।
দাসী অত্যাশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, হে চিত্তমুগ্ধকর বাগের কচি মুকুল! তোমরা কে? কোত্থেকে আসছো?
একবারের দংশিত ছিলেন, কোনউত্তর দেওয়ার পরিবর্তে ভয়ে-ত্রাসে কাঁপতে লাগল। উথল অশ্র“তে চেহরাভিজে গেল।
দাসী  সান্ত্বনার সুরে বল্ল, পরম মমতায় পালিত দুলাল! কোন প্রকার সংশয় করোনা। অন্তর হতে ভয় বেরকরে দাও। বিশ্বাস কর, আমিতোমাদের ঘরের ভিখারী, শত্র“ নই। তোমরা না বল্লেও তোমাদের আলোকময় চেহরা এটা বুঝার জন্য যথেষ্ট যে, তোমরা বিবি ফাতেমার বাগানের ফুল।
সত্য বল, তোমরা উভয়ই কি ইমাম মুসলিমের শিশু হও? দাসী চেহরার ধূলি-বালি ঝাড়তে-ঝাড়তে বল্ল, আকাশ পরে উপবেশনকারী শাহযাদা! কীট-পতঙ্গের বাসা হতে বের  হও। এসো আমার হৃদয়ে বস, নয়নে উপবেশন কর।
দাসীর অনুনয়-বিনয়ে শিশুদ্বয় বৃক্ষগুহা হতেবেরিয়ে এল এবং সহমর্মী সহানুভতিশীল মনে করে নিজেদের সমস্ত বৃত্তান্তবলে দিল।
তাঁদের মর্মষ্পশী কাহিনীশুনে দাসীর অন্তর ভারী হয়ে ওঠল। দু’নয়নে শ্রাবণ-ভাদ্রের বর্ষা নামল। হৃদয়ের অ¯ি’রাব¯’াআয়ত্বে এলে শিশু দু’টিকেঝরণার নিকট নিয়ে গেল। অশ্র“ মোচল, মুখ ধোয়ে দিল, চুলের ধূলি-বালি পরিষ্কার করল। অতঃপর অভয় দিয়ে নিরাপদ পথে ঘরে নিয়ে গেল। গৃহকর্তী নবী বংশের প্রতি অত্যাসক্ত ছিল।
দাসী আপন গৃহকর্তীর সম্মুখে শিশু দু’টিকে পেশকরে  বলল, ‘বেগম পরম সৌভাগ্য! ফাতেমী গুলবাগিচার দু’টি ফুল নিয়ে এসেছি। এ দুই জন ইমাম মুসলিমের দুলাল। পিতাহারা ইয়াতিম শিশু। পরদেশে তাদের কেউই নেই। তাদের অসহায়ত্ব ও অনাথত্বে স্নেহ পরবশ হওয়ার পরিবর্তে জালেমরাএখন এ নিস্পাপ শিশুদের রক্তের পিছু নিয়েছে। ভয়ে-ত্রাসে কচি কলজে শুকিয়ে গিয়েছে। হাশেমীপরিবারের এ দুইটি লাল ভয়ে  বৃক্ষগুহায় লুকিয়ে ছিল।
বিবি! বেলা অনেক হয়েছে কিš‘ মাতৃকোলহতে নির্গত দুগ্ধপোষ্য শিশু দু’টির পেটে একটি দানাও পড়েনি।
গৃহকর্তী সমস্ত ঘটনা শুনে ব্যাকুল হয়ে ওঠল, আকুল ক্রন্দনে তার আঁচল ভিজে গেল। প্রবল অনুরাগে বা”চাদের কোলে তুলে নিল। চেহরায় চুমু দিল, মাথায়হাত ফেরাল এবং নায়ে-ধোয়ে কাপড় পারিবর্তন করল। চোখে সুরমা লাগাল, চুল চির“নী করল এবং পানাহার করিয়ে একটি সংরক্ষিত কক্ষে আরাম করার জন্য বিছানা পেতে দিল।
পদে-পদে স্নেহ-মমতার উর্মিমালা দেখে প্রবাসী শিশুদের মায়ের কথা মনে পড়ল। মমতার কোলে পালিত আহ্লাদ জেগে ওঠল আর অমনিইঅ¯ি’র হয়ে কাঁদতে লাগল।
পুস্পবৎ আননে প্রবাহমান অশ্র“ দেখে গৃহকর্তী অ¯ি’র হয়ে গেল। দৌঁড়ে এসে বক্ষে জড়িয়ে নিল। আপন আঁচলে অশ্র“ মুছে সান্তনা দিয়ে বলল,
নয়নমণিরা! এটিকে নিজের ঘর মনে কর! তোমাদের কদমে আমার প্রাণোৎসর্গ, আমার জীবন বলি। আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি তোমাদের যাবতীয় আব্দার পূর্ণ করবো। তোমাদের পদস্পর্শেআমার আশার বাগিচায় বসন্তের সজীবতা এসেছে। আমার আঙ্গিনায় রিমঝিম নূরের বৃষ্টি বর্ষিতেছে।
রাতের ভয়ানক অন্ধকার সব দিকে বিস্তৃত। ইমাম মুসলিমের ছেলেদের খুঁজে হুকুমতের গোয়েন্দা ও দুনিয়ালিপ্সু কুকুররা অলি-গলি ফিরছে।
অনেকক্ষণ ধরে গৃহকর্তী-তার স্বামী “হারিস” এর অপেক্ষায় জেগে রইল। রাত এক প্রহর অতিবাহিত হলে সেহাঁফতে-কাঁপতে পরিশ্রান্ত ঘরে ফিরল।
এ অব¯’া দেখে স্ত্রী হতচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, আপনাকে আজ এত পরিশ্রান্ত ও চিন্তিত দেখা”েছ কেন?
দম নিয়ে উত্তর দিল, তুমিহয়তো জাননা যে, বিদ্রোহীমুসলিমের সাথে তার দুই পুত্রও এসেছিল। কয়দিন পর্যন্ত কূফায় আত্মগোপনকরে ছিল। পরশু সকালে মদীনার দিকের রাস্তা হতে গ্রেফতার করে, জেলের দারগার যোগসাজেশে তারা পলিয়েছে।
ইবনে যিয়াদের পক্ষ থেকে সাধারণ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যে তাদের ধরে আনবে, তাকে দাবী মতো পুরস্কার দেওয়া হবে।
সময়ের সব চেয়ে বড় মর্যাদা লাভের জন্য এর চেয়ে বেশি সুবর্ণ সুযোগ আর হাতে আসবেনা বেগম! সকাল হতেই ওই শিশদের খোঁজে লেগে আছি। দৌঁড়তে-দৌঁড়তে বেহাল দশা। এখনও কোন সূত্র পাওয়া গেলনা।
হারিসের কথা শুনে স্ত্রীর কলজে জ্বলে ওঠল। মনে মনে রাগ-গোস্সা হজম করল। বিমুগ্ধকারী চিত্তাকর্ষক ঢঙে স্বামীকে বুঝাতে শুর“ করল। “ইবনে যিয়াদ অহেতুক আলে রাসূলের রক্ত প্রবাহিত করে নিজের পরিণতি খারাপ করছে। দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ক্ষণ¯’ায়ী। পুরস্কারের লোভে জাহান্নামের ভয়ানকশাস্তি কিনে নিওনা।
আপন অন্তরে হাত রেখে একটুচিন্তা কর“ন! কাল হাশর-ময়দানে আমরা রাসূলুল্লাহকে কীভাবে মুখ দেখাব?”

ফোরামে আছি ।

Share

জবাব: কল্প গল্প নয় সত্যনিষ্ঠকাহিনী [পর্বঃ ০৪]

হারিসের অন্তর পুরোপুরি কৃষ্ণ হয়েছিল। স্ত্রীর কথায় তাতে কোন প্রভাবই পড়লনা।
ধমকের সাথে উত্তর দিল, ‘নসিহত করার দরকার নেই। পরিণতির লাভ-ক্ষতি আমি নিজে বুঝতে পারি। আমার সংকল্প অটল; আপন অব¯’ান হতে কেউই আমাকে হটাতে পারবেনা।’
পাষাণান্তর স্বামীর কু-নিয়্যাত জানার পর মুহূর্তে-মুহূর্তে অন্তরকেঁপে ওঠছে যে, খোদা না কর“ন, জালেম শিশুদের গন্ধযেন পেয়ে না বসে। এ কারণে তাড়াতাড়ি পানাহার করিয়ে শুয়ে দিল এবং ঘুম না আসা পর্যন্ত শিহরে বসে কথায় ভুলাতে রইল। সে ঘুমিয়ে পড়লে সতর্ক পায়ে ওঠে শিশুদের কক্ষ তালাবদ্ধ  করে দিল।
দুশ্চিন্তায় চোখের ঘুম উবে গেল। থেকে থেকে অন্তরে ব্যথা অনুভূত হ”িছল, ‘হায় আল্লাহ! নবী-অন্তপুরের এ রাজদুলালদের কিছু হলেতো হাশরের দিন খাতুনে জন্নাতকে আমার পোড়া মুখ কী করে দেখাব?
দুনিয়াবাসী ক্বিয়ামত পর্যন্ত আমার মুখে থুথু দেবে যে, আমি নবীযাদাদের সাথে প্রতারণা করেছি; তাঁদের মিথ্যা আশ্বাস  দিয়ে বধ্যভূমির পথে নিয়ে এসেছি। আহা! আমার পবিত্র প্রেমের সকল মর্যাদা পদদলিত হয়েছে, আমার সুন্দর স্বপ্ন চুরচুর হয়ে গিয়েছে।
হায় আফসোস! এ ঘরকে ওই অবুঝ শিশুরা নিজের ঘর মনেকরছে। কোন ভাবে এ গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে গেলে তাদের কচি মনে কি আসবে। তারা নিজ ধারণায় আমাকে কি মনে করবে। পরš‘ আমার হৃদয়ের অব¯’াতো খোদা ও রাসুল থেকে গোপন নয়। যা-ই হোকনা কেন, প্রাণ থাকতে প্রাণপ্রিয়দের ওপর কোন বিপদ আসতে দেবন।
হে আল্লাহ! আমাকে আমার প্রেমাষ্পদদের প্রেমে দৃঢ়পদ রাখুন, তাঁদের অশ্র“র মুক্তা ঝড়ার  আগে আমার কলিজার খুন প্রবাহিত করে দিন।
রাত্রি শেষ প্রহর, কূফার দুর্ভাগা অঞ্চলে চতুর্দিকে নিদ্রার নীরবতা বিস্তৃত। হারিসও আপন ঘরে বেখবর ঘুমিয়ে আছে।
উভয় শিশু বদ্ধ কুটিরে নিদ্রাবিভোর ছিল। এমনি আব¯’ায় তাঁরা অতি বেদনাদায়ক ও উত্তেজনাকরস্বপ্ন দেখল।
কাওসারের সরোবরের শুভ্র উর্মিতে নূরের কিরণ ঠিকরে পড়ছে। ফিরদাউস-উদ্যানের সড়কসমূহে চাঁদের আলো ঝিকমিক করছে। কিছু তফাতে শাহানশাহে কাওনাইন (দ.), মাওলায়ে কায়েনাত হযরত হায়দর (রা.), খাতুনে জন্নাত বিনতে রাসূল ফাতেমা বতুল (রা.) ও  মজলুম শহীদ হযরত ইমাম মুসলিম (রা.) উপবেশিত আছেন।
শিশুদ্বয়ের প্রতি দৃষ্টি পড়তেই সরকারে দু‘আলম (দ.) ইমাম মুসলিমকেসম্বোধন করে বললেন,
“মুসলিম! তুমি নিজেতো এলে আর জোর-জুলুমের নিশানা হওয়ার জন্য আমার কলিজার টুকরোদের পাপিষ্ঠদের হাতে ছেড়ে এলে।”
হযরত ইমাম মুসলিম অবনমিত দৃষ্টিতে উত্তর দিলেন, তারাও পিছে-পিছে আস্ছে হুযূর! অতি নিকটেই  এসে পৌঁছেছে, শুধু দু’চার কদমের দূরত্বই বাকি রয়েছে। আল্লাহ চাইলে আগামী দিনের রবি উদিত হতেই দয়ার চাঁদরের শীতল ছায়ায় লেপ্টে যাবে।
এ স্বপ্ন দেখে দুই ভাই আঁতকে ওঠল। বড় ভাই ছোট্টভাইকে নাড়া দিয়ে বল্ল, “এখন ঘুমাবার সময় নয়। আমাদের জীবন-রজনীর ভোর হয়ে গিয়েছে।
ভাইয়া উঠ! বাবাজান সংবাদ দিয়েছেন যে, এখন আমরা কয়েক ঘন্টার অতিথি। হাউসে কাওসারে নানা হুযূর আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। নিরাপত্তার রাজ্য অতি অ¯ি’রতায় আমাদের পথ চেয়ে আছেন।
ভাইয়া ধৈর্য ধর! এখন শত্র“দের রক্তপিপাসু তরবারীর তল হতে বের হওয়াবড় মুশকিল। এখন মদীনা ফিরে যাওয়া ভাগ্যে জুটবেনা। হায়! আম্মাজানের সাথে অন্তিম সাক্ষাতও হবেনা”।
ছোট্ট ভাই ছলছল নয়নে উত্তর দিল, “ভাইজান! আমিওঅনুরূপ স্বপ্ন দেখেছি। সত্যিই কি কাল সকালে আমাদের হত্যা করে দেওয়া হবে?”
“হায়রে! একে অপরকে যবেহ হতে কী করে দেখবো, ভাইয়া?”
এ কথা বলে দু’ভাই পরস্পরের গলায় হাত দিয়ে লেপ্টে গেল এবং হুহু করে কাঁদতে লাগল।
ভাগ্যও তাকে ছিল, অ¯ি’র ক্রন্দনের শব্দে জল্লাদ হারিসের ঘুম ভেঙ্গে গেল। হায়-হায়! ঘুমন্ত ক্বিয়ামত জেগে ওঠল। জালেম স্ত্রীকে জাগিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“শিশুর ক্রন্দনরোল কোত্থেকে আস্ছে?” অব¯’ার নাজুকতায় স্ত্রীর কলজে শুকিয়ে গেল।  সে টলতে-টলতে উত্তর দিল, “শুয়ে পড়–ন! কোথাও প্রতিবেশির বা”চা কাঁদছেহবে।”
পাষাণান্তর কন্ঠস্বর অষ্টমে তুলে বল্ল, ‘প্রতিবেশির ঘর থেকে নয়, আমাদের ঘর হতেই     এ শব্দ আসছে। হতে পারে মুসলিম ওইশিশুরাই, যাদের খোঁজে কয়দিন ধরে ঘুরে মরছি।”
একথা বলে ওঠল এবং ওই কুটিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তালা ভেঙ্গে দরজা খুলে ভিতরে গিয়ে দেখল যে, শিশুদ্বয় কাঁদতে কাঁদতে বেহাল হয়ে আছে। কর্কশ স্বরে জিজ্ঞাসা করল, “তোমরা কারা?” হঠাৎ অপরিচিত এ শব্দ শুনে শিশুদ্বয় জড়সড় হয়ে গেল। পরš‘ ওইঘরকে যেহেতু  নিরাপদ মনে করেছে, সেহেতু এ কথা বলতেএকটু দ্বিধা হয়নি যে, আমরা ইমাম মুসলিমের অনাথ শিশু।
এ কথা শুনে জালেম রাগে পাগল হয়ে গেল। আমিতো চতুর্দিকে খুঁজতে হয়রানআর তোমরা আমার ঘরেই আরামেঘুমিয়ে আছ।
এ কথা বলে সম্মুখে এগোল এবং অতি নিষ্ঠুরতায় কচি ইয়াতিমদের মুখে থাপ্পড়মারতে শুর“ করল। ব্যথা-বেদনায় দুই ভাই কুঁই-কুঁই করে ওঠল। ব্যাকুল স্ত্রী দৌঁড়ে এল এবং এ কথা বলে মধ্যখানে দাঁড়িয়ে গেল।
“আরে জালেম! এ কী করছ? এরা ফাতেমা রাজদুলার, এদের শশীরূপ সুরতের প্রতি দয়া-মায়া কর।
হাত র“খ জুলুমবাজ! জন্নাতের ফুলের সোহাগ লুটনা, উর্ধ্ব জগতের বাগানের কোমল কলিকে আঘাত জর্জরিত করনা।”
পিতাহীনের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে চেষ্টা কর জালেম! অতঃপর মমতার ঝুঁকে ওঠে স্বামীর পায়ে মাথা টুকতে লাগল। নাও! আমার মুণ্ড দলে-মথে নিজের বিদ্বেষাগুন নিভাও। পরš‘ ফাতেমার হিয়ার টুকরোদেরক্ষমা করে দাও।
রাগে অগ্নিশর্মা পাষাণান্তর স্বামী তাকে এক জোরে লাথি দিল যে, এক খুঁটির সাথে ঠক্কর খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে গেল।
থাপ্পড় মারতে-মারতে যখনক্লান্ত হল, তখন ওই চির¯’ায়ী পাপিষ্ঠ দুই ভাইকে আঁট -সাঁট করে কাবার গিলাফের জুলন্ত চুলগু”ছ কষে একত্রে বেঁধে দিল।
ত্রাসে শিশুদের রক্ত শুকিয়ে গেল। কন্ঠে শব্দ আটকে গেল, চোখের অশ্র“ জ্বলে গেল।
অতঃপর ওই কৃষ্ণ-কপাল এ বলে কুটির হতে বেরিয়ে এল, ‘যত ধড়ফড় করার সকাল পর্যন্ত করে নাও। দিবসের আলো ফুটতেই আমার চমকদার তলোয়ার তোমাদের চির দিনের জন্য সু¯ি’র নিদ্রায় শুয়ে দেবে।”
দরজা তালাবদ্ধ ছিল। ভিতরের অব¯’া আল্লাহই জানেন। এমনিতে ওই কচিপ্রাণে শক্তিও কোথায়যে, ক্রন্দনরোলের রব শুনাযাবে।

ফোরামে আছি ।

Share

জবাব: কল্প গল্প নয় সত্যনিষ্ঠকাহিনী [পর্বঃ ০৪]

অবশ্যই বন্দিখানারকুটির হতে থেকে থেকে অস্ফুট হায় হায় ধ্বনি শুনা যা”িছল।
ক্বিয়ামতকে ডাক! বড় বাহদুরী তার আপন দৃশ্যের ভয়ানকত্বে; সোয়াবর্শা-ওপরি সূর্যও সাইয়্যেদারদুগ্ধপোষ্য শিশুর বন্দিত্বের তামাশা দেখুক।
মাহশরবাসীদেরও একটু আগ বাড়িয়ে ডাক, তারাও স্বাক্ষী হোক, যে মুহাম্মদ আরবীর সম্ভ্রমের ইঙ্গিতে কাল তাদের বেড়ি টুটে পড়বে, আজ তাঁরই কোলের শিশু শিকলে বাঁধা কেঁপে কেঁপে কাঁদছে।
হায়রে উ”চ ¯’ানের ক্বিয়ামত! বড় বড় পুস্পানন, শশীললাট ও গুলবদনের রূপের চিত্রশালা তুমি দিন দুপুরে লটে নিয়েছ আর তোমার বির“দ্ধে কোথাও নালিশ পর্যন্ত হয়নি।
আশার রক্তের লালীমা নিয়ে থরথরিয়ে সকাল হল, ঘন মেঘের আড়ালে মুখ লকিয়ে সূর্য ওঠল, যখনই ঈমানের শত্র“ রক্তপিপাসুতরবারী হাতে বিষমাখা খড়গ সঙ্গে রক্তভুক্ত পশুর ন্যায় কুটিরের দিকে কুঁদে যেতেই নেকবখ্ত স্ত্রী দৌঁড়ে এসে পেছন থেকে তার কোমর ধরে ফেলল। অত্যাচারী স্বামী এতই জোরে ঝাড়া দিল যে, মাথা একটি প্রাচীরের সাথে লেগে ফেটে গেল এবং সে আহ রবে ভূমিতে পতিত হল।
স্ত্রীকে কুপোকাত করে তীব্র রাগে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। হাতে নগ্ন তরবারী ও চমকদার খড়গ দেখে দুই ভাই থরথর করে কাঁপতে লাগল। ভয়ে সুরমামাখা আঁখি বন্ধ হয়ে গেল। এখনও তারা ওই ভয়ানক ত্রাসে কাঁপতে ছিল আর এ পাপাত্মা আগ বাড়িয়ে চুলের গু”ছ ধরে অতি কঠোরতায় তাদের টেনে বের করল। অসহ্য যন্ত্রণায় অবুঝ শিশুদ্বয় কাতরাতে লাগল।সক্রন্দন অনুনয়-বিনয় করতে লাগল কিš‘ পাষাণ পাষণ্ডের অন্তরে দয়া-মায়া ছিলওনা উদ্রেকও ঘটলনা।
রক্তাক্ত স্ত্রী আবার ওঠল এবং ঘায়েল ব্যঘ্রের ন্যায় সগর্জনে বল্ল, “শেষ পর্যন্ত টেনে-হেঁচড়ে কোথা নি”ছ, ওই নিস্পাপ মুসাফিরদের? শত্র“তা ছিলতো তাঁদের বাবার সাথে ছিল। দু’চার দিনের অবুঝ শিশুর সাথে কিশত্র“তা, তোমরা তাঁদের রক্ত প্রবাহে বদ্ধপরিকর।
সমস্ত জগত অনাথ শিশুর প্রতি স্নেহ-মমতা প্রদর্শন করে আর তুমি রাতথেকেই তাদের বেড়িতে বেঁধে রেখেছ। থাপ্পড় মারতে মারতে পুস্পকোমল চেহরা রক্তাক্ত করে দিয়েছ। দয়ার মেঘমাল রূপ জুলন্ত কেশর গু”ছ এতইনিষ্ঠুরতায় টানছ যে, লোমকূপ হতে রক্ত বইতে লাগল।
রাত  হতে এখন পর্যন্ত মদীনার প্রিয়তমরা ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত নিরব”িছন্ন তোমার জোর-জুলুমের আঘাত খাইতে আছে আর তাঁদের শৈশবের প্রতিও তোমার মায়া হ”েছনা। পরদেশে তাঁদের কোন হিতাকাঙ্খী-সাহয্যকারী নেই। তাই অসহায় মনে করে তুমি তাঁদের ধুঁকে ধুঁকে মারছ! যে নবীর কলেমা পড়, তিনি যদি রওযা শরীফ হতে বেরিয়ে আসেন তবে তাঁর সামনেও তার প্রিয় শাহযাদাদের সাথে এ আচরণ করতে পারবে।
তোমার বাহুতে যদি এতই বল থাকে তবে কোন যুবক পুর“ষের সাথে পাঞ্জা লড়ে দেখ, দুগ্ধপোষ্য শিশুর সাথে কি বাহদুরি দেখা”ছ।
স্ত্রীর অন্তরে ঈমানী তেজ আগ্নেয়গিরিবৎ অগ্ন্যুৎপাত করছিল। সে জানবাজি রেখে বন্ধুত্বেরহক্বের শেষ ফয়সালা করে দিতে চায়।
প্রবল আকর্ষণে চঞ্চল হয়ে তার হাত হতে শিশুদেরছোড়ানোর প্রচেষ্টা করতেই ওই পাষাণ্ড মুষ্টিবদ্ধ হাতে তার বক্ষে এমন ঘুষি দিল যে, সে বেহুশ হয়ে ভূমিতে পতিত হল। দাসী এগিয়ে এল সেও তার আঘাতে কুপোকাত হল।
অতঃপর দড়িতে বাঁধা দুই ভাইকে টেনে-হেঁচড়ে বের করে মালের ন্যায় খ”চরের পিঠে বেঁধে ফোরাত পানে ছুটল। রশিতে বাঁধা ইমাম মুসলিমের ইয়াতিম বন্দি এখন বধ্যভূমির দিকে আস্তে-আস্তে অগ্রসর হ”েছ। নিরাশ চেহরায় অসহায়ত্বের অনুশোচনা বর্ষিত হ”েছ। মুহূর্তে-মুহূর্তে অন্তরের ধুকধুকতীব্র হ”েছ।
থেকে থেকে মায়ের কোল, মায়া-মমতার দোলনা, মদীনার নিরাপদ গৃহ, আয়শাসিদ্দীকার কক্ষ স্মরণে আসছে। দলিত-মথিত আকাঙ্খার ভিড়ে ছোট্ট ভাইয়ের চোখ ছলছল করে ওঠল। দীর্ঘ নীরবতার পর অশ্র“র দমিত তুফান উবলে ওঠল। বড় ভাই আস্তিনে অশ্র“ মুছে বল্ল, “প্রাণপ্রিয়! ধৈর্য ধর! বুকে হিম্মত রাখ! এখন জীবনের কয়েকটি শ্বাস বাকি আছে, তা অ¯ি’রতায় বিনষ্ঠ করোনা। ওই দেখ ফোরাতের বুকে কাওসারের শুভ্র উর্মিমালা আমাদের শির তুলে দেখছে। এখন এ ক্ষণ¯’ায়ী জগত হতে নোঙ্গর তুলে নাও। কয়েক কদম পর চির¯’ায়ী জগতের সীমা শুর“ হতে চলছে। বেশ দুই মিনিট পর আমরা এ মিছাভবের নাগালের বাইরে চলে যাবো। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর ফোরাত নজরে পড়ল। জল্লাদ তার তলোয়ার চমকিয়ে বল্ল, ‘সর্পের ছানা! দেখে নাও নিজ বধ্যভূমি! এখানে তোমাদের মস্তক কর্তন করে সারা জগতবসীর জন্য শিক্ষাপ্রদ তামাশা রেখে যাবো’।
এ কথা শুনে শিশুদের রক্ত শুকিয়ে গেল। ফোরাতের পাড়ে পৌঁছে ওই আদি পাপিষ্ঠ গ”চরের পিঠ হতে নামাল, বাঁধন খুলল, সামনে দাঁড় করাল; এখন দুই ভাই খোলা চোখে মাথার ওপর নিত্যমান নিয়তি দেখতে পা”েছ। চরম অসহায়ত্বে ছলছল নয়নে আকাশ পানে দেখতে লাগল।
যখনই নগ্ন তরবারী উঁচিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে জালেম হারিস এগিয়ে এল, মজলুম শিশুদ্বয় আপন কচি হাত তুলে দয়ার আবেদন জানাল। এমনি সময় হাঁফতে-কাঁপতে, ওঠতে-পড়তে হৃদ্যতা-বিশ্বস্ততার মূর্তপ্রতীক বিবি এসে পৌঁছল।
আসা মাত্রই সে পেছন থেকে স্বামীর হাত ধরে ফেল্ল এবং এক অক্ষম ও অসহায়ের ন্যায় তোষামোদ করে বল্ল,“আল্লাহর ওয়াস্তে এখন হলেও দমে যাও। আলে রাসূলের রক্তে আপন হস্ত রঞ্জিত করোনা। দয়া ও সহানুভূতির অনুরাগে একবার চোখ তুলে দেখ! শিশুদের কচি প্রাণ শুকিয়ে যা”েছ। তরবারী সরিয়ে নাও জালেম”।
নফসের শয়তান পূর্ণরূপে চড়াও হয়েছিল। সমস্ত অনুনয়-বিনয় বেকার গেল।রাগে ভরপুর তরবারীর একটি আঘাত স্ত্রীর ওপর হানল, ওই ঈমানের মূর্তি ঘায়েল হয়ে ধড়ফড় করতে লাগল। শিশুদ্বয় এ বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখে জড়সড় হয়ে গেল। এখন পাপিষ্ঠ জল্লাদ রক্তাক্ত তলোয়ার নিয়ে শিশুদের নিকট বাড়ল। ছোট্ট জনের ওপর আঘাত হানতে চাইলে বড় ভাই চিৎকার দিল, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে প্রথমে আমাকে হত্যা কর। প্রাণাধিক প্রিয় ভাইয়ের ছটপটকারীলাশ আমি দেখতে পারবোনা।”
ছোট্ট ভাই মাথা নত করে তোষামোদ করল, “বড় ভাইয়ের হত্যার দৃশ্য আমি কখনো দেখতে পারবোনা। আল্লাহর দোহাই প্রথমে আমার শিরো”েছদ কর”।
এ হৃদয়বিদারক দৃশ্যে উর্ধ্ব জগতে হৈচৈ পড়ে গেল। শাহানশাহে কাওনাইন (দ.) কলিজা ধরে আল্লাহর মর্জির ওপর ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ ছিলেন।

ফোরামে আছি ।

Share

জবাব: কল্প গল্প নয় সত্যনিষ্ঠকাহিনী [পর্বঃ ০৪]

সৈয়্যদায়ে কায়েনাত (রা.)’র আত্মা চঞ্চল হয়ে আল্লাহর আর্শের দিকে ওঠতে চাইল যে, জগত ওলট-পালট করে দিতে কিš‘ পদে পদে সরকারে দু’আলম (দ.) ইঙ্গিত তাঁকে বাঁধা দি”েছ।
খায়বর বিজেতা হায়দার (রা.) আপন যূলফিক্বার হাতে নিয়ে সরকারে মদীনা (দ.)’র অনুমতির অপেক্ষায় ছিলেন যে, মুহূর্তে জালেমদের কর্মফল পর্যন্তপৌঁছে দিতে। রূহুল আমীন ডানা ছেড়ে চুপচাপ রইলেন। জন্নাতের প্রহরী রিদওয়ান কাওসার ও তাসনীমের সাগর নিয়ে অপেক্ষা করছেন। আলমে বরযখে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। ফিরিশতার জগতেসম্মোহন চালু ছিল যে, একটি বার বিদ্যুৎ চমকিল, তারকা টুটে পড়ল, দু’টি অস্ফুট শব্দ ধ্বনিত হল।
জগত হেলে ওঠল, আকাশের চক্ষু লজ্জায় অবনত হল, বায়ু প্রবাহ স্তিমিত হল,জলস্রোত থমকে দাঁড়াল, মহাকালের কলজে বিদীর্ণ হল; সম্মোহন কেটে গেলে ইমাম মুসলিমের ইয়াতিম শিশুর খণ্ডিত মস্তক রক্তে ছটফট করছে এবং দেহ ফোরাতের উর্মিমালায় নিমজ্জিত হ”েছ। হে মুহম্মদ ও ইব্রাহীম আপনাদের ওপর সালাম! হে ইমাম মুসলিমের যুবরাজরা!আপনাদের পবিত্র রক্তের লালীমায় আজ পর্যন্ত ইসলামের বাগিচার বসন্তেরসৌরভ প্রতিষ্ঠিত।
সর্বময় ক্ষমাশীল-ক্ষমতাধর আল্লাহ আপনাদেরসমাধিতে সকাল-সন্ধ্যা নূরে বারি বর্ষণ কর“ন।
“পতঙ্গের অব¯’া এ সভায় ইর্ষাযোগ্য হে দিব্য দৃষ্টিধর,
এক রাতেই সে জন্ম হল আশেকহল প্রাণও দিল।”

ফোরামে আছি ।