টপিক: ধারাবাহিক : মিসওয়াকের মহাবিস্ময়কর রুপ (১০ম পর্ব)

মিসওয়াক ব্যবহারকারী
মানুষ জন্ম গ্রহণ করে শিশু হিসাবে কিন্তু এক সময় শিশু বড় হয় এবং এক সময় মৃত্যু বরণ করে। আবার কেউ শিশু অবস্থায়, কেউ যুবা অবস্থায়, কেউ তরুণ অবস্থায় কেউবা বৃদ্ধ অবস্থায় মারা যায়। অর্থাৎ মৃত্যু আসার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। যে কোন সময় মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। তবে এ কথাতো সত্য যে জীবন ধারার সকল পর্যায়ে মানুষকে একই রকম কাজ করতে হয় না। যেমন শিশুকে চাকুরী করে সংসার চালাতে হয় না, শিক্ষককে মাছ ধরে জীবিকা চালাতে হয় না, জেলে এসে পাঠশালায় শিক্ষা দেয় না, তেমনি বয়স উপযুক্ত না হলে নামায ফরয হয় না, উপযুক্ত বয়স না হলে রমজানের রোজা রাখা জরুরী নয়, সামর্থ্য না থাকলে হজ্জ করতে হয় না। অন্য দিকে প্রাকৃতিক নিয়মগুলো যেমন প্রস্রাব পায়খানা করা, খাওয়া সবারই করতে হয়। না হলে জীবন ভারসাম্যপূর্ণতো নয়ই জীবনকে স্বাভাবিক ভাবে, সুস্থ ভাবে ধরে রাখা যায় না। তেমনি মিসওয়াক এমনই একটি প্রাকৃতিক নিয়ম যা সকল পর্যায়ের মানুষের তথা সকল বয়সের মানুষের জন্য মেনে চলা জরুরী। নইলে জীবন ভারসাম্যহীনতায় ভূগে এবং জীবনে বিশৃংখলা ঘটে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে অন্য যে সব জীবনধারী আছে তাদেরও কি মিসওয়াক করতে হবে? প্রশ্নটা বেশ হাস্যকর হতে পারে। কারণ গরু কি মিসওয়াক করতে পারবে? ছাগল, ভেড়া, তিমি মাছ, হাঙ্গর, কুমির কিংবা মহিষের কি দাঁত পরিষ্কার করতে হবে? যদি কথা আসে যে যাদের দাঁত আছে তাদের ব্রাশ করতে হবে তাহলে কথা আসে এদেরও তো তাহলে ব্রাশ করতে হবে। এটি শুনতে হাস্যকরই বটে। কারণ গরু কিভাবে দাঁত ব্রাশ করবে? ভেড়া, ছাগল, মহিষ? এদের তো মিসওয়াক ধরার অঙ্গই নাই। এবার তাহলে উত্তর দাড়াচ্ছে, না এদের মিসওয়াক করতে হবে না। কেন? সহজ উত্তর, সবার বা সব জিনিসের সব রকম কাজ নয়। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন একই সাথে একই বিষয়ের উত্তর হাঁ না কিভাবে হতে পারে? প্রকৃত পক্ষে কথা হল এদের দাঁত পরিষ্কার করা প্রয়োজন আছে কিন্তু যেহেতু প্রাকৃতিক ভাবেই সম্ভব নয় তাই এদের প্রয়োজন নেই। ওরা মিসওয়াক করতে পারে না বলেই যখন হা করে হাই তুলে তখন আশে পাশে গন্ধের কারণে থাকা যায় না। ওদের সংস্পর্শে আমরা সব সময় থাকি না তাই ওরা মিসওয়াক না করলেও চলে কিন্তু আমরা যেহেতু সব সময় মানুষের সংস্পর্শে থাকি বা থাকতে হয় তাই আমাদের অবশ্যই মিসওয়াক করতে হবে। এমনকি শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সের মানুষকেই। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম এর সকল নির্দেশ পালন করতে হবে। তিনি যে বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন সে গুলোকে গুরুত্বের দিক থেকেই পালন করতে হবে। তিনি বলেছেন ‘আমি তোমাদেরকে বেশি বেশি মিসওয়াক করার তাগিদ দিচ্ছি। (হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, বোখারী শরীফ, রিয়াদুস সালেহীন)। প্রিয় নবী আমাদের অর্থাৎ সকল বয়সের মানুষের প্রতি এ নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু তাঁর উম্মতের জন্য নয় গোটা মানবগোষ্ঠীর জন্যই এ নির্দেশ। তাছাড়া শেষ নবীর পূর্বে যে সকল নবীগণ এসেছিলেন তাদের জন্যও মিসওয়াক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হযরত মুয়াজ (রাঃ), রাসুল সাল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম হতে বর্ণনা করেন, যায়তুন গাছের মিসওয়াক কতইনা উত্তম! এটা হচ্ছে পবিত্র বৃক্ষের অংশ যা মুখকে দূর্গন্ধমুক্ত ও মুখের ক্ষত দূর করে। এটা হচ্ছে আমার মিসওয়াক ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের মিসওয়াক।
উপরোক্ত হাদিসে যদিও শুধু যায়তুন গাছর কথা বলা হয়েছে। এমন মনে হতে পারে যে, অন্য গাছের মিসওয়াক দিয়ে এ হাদিসের অনুসরণ হবে কিনা? এর উত্তর পাবার জন্য একটু অন্য প্রসঙ্গের হাদিস উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি।
‘ Go in quest of knowledge even unto China’
(i, e; even unto the `edge of the earth). (Hadith No 101. The saying of Muhammad (s m); Islamic Foundation Bangladesh).
অর্থাৎ ‘তোমরা জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও’। এমনকি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে হলেও। সুতরাং যায়তুন শুধু মিসওয়াক নয় অন্যান্য বৃক্ষের দ্বারাও মিসওয়াক করা যাবে। চীন দেশ দ্বারা এখানে দুরত্ব বুঝানো হয়েছে। (তবে অনেকে এই হাদিসকে প্রকৃত সনদহীন, জাল বা বাতিল হাদিস বলেছেন। সূত্র ঃ হাদিসের নামে জালিয়াতি : প্রচলিত মিথ্যা হাদিস ও ভিত্তিহীন কথা, পৃষ্ঠা নং ৩৪০ এবং য’ঈফ ও জাল হাদিস সিরিজ এবং উম্মতের মাঝে তার কুপ্রভাব, পৃষ্ঠা নং ৩৬৭)।
যেহেতু মিসওয়াক করা আমাদের নবী এবং পূর্ববর্তী নবীগণের জন্য ছিল তাই সবাইকে মিসওয়াক করতে হবে। আমরা শিশুদের কোলে নিয়ে চুমু খাই, আদর করি, বুকে জড়িয়ে ধরি, বন্ধুদের সাথে মোলাকাত করি, কোলাকুলি করি, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতি বিভিন্ন ভাবে ভালবাসা প্রয়োগ করি, জ্ঞানী লোকদের কাছ থেকে অনেক জ্ঞানের কথা শ্রবণ করি, দাদা-দাদি, নানা-নানিদের বুকের মাঝে লুকিয়ে গল্প শুনি, শিক্ষকের কথা শুনি ইত্যাদি। সুতরাং কোন সময় মিসওয়াক না করার কারণে যদি দূর্গন্ধ ছড়ায় তাহলে ভালবাসার তীব্র বন্ধনে দুরত্ব সৃষ্টি হবে। আর এ জন্য সকল বয়সীদেরই মিসওয়াক করতে হবে।
শিশুদের জন্য মিসওয়াক ঃ আজকের দিনের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুতরাং সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে শিশুদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। আর এ জন্য প্রয়োজন শিশুদের প্রতি বিশেষ যতœ। শিশুদের জন্য মিসওয়াক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাথমিক অবস্থায় শিশুদের মুখে ব্রাশ তুলে দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে প্রতিবার খাওয়ার পর এক টুকরা ভিজা কাপড় দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করে দিতে হবে। তবে বড়রা মিসওয়াক চিবিয়ে নরম করে নিয়ে তা ধুয়ে শিশুকে মিসওয়াক করতে দেয়া যাবে। ৬ মাস বয়স থেকে একটা শিশুর দাঁতের যতেœর ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। শিশুরা সাধারণত মিষ্টিজাতীয় খাদ্য যেমন চকলেট, লজেন্স, চুইনগাম, বিস্কুট খুবই পছন্দ করে। এছাড়া দুধ, ফলমুল, শরবত, ঠান্ডা পানীয়, চিনি, গুড় প্রভৃতি গ্রহন করে থাকে। যার কিছু অংশ দাঁতে লেগে থাকলে ক্যারিজ হতে পারে বা হবেই। এজন্য অধিকাংশ অভিভাবক চুইনগাম, চকলেট বা লজেন্স খেতে গেলেই ছি-ছি করে উঠেন যা মোটেই ঠিক নয়। কারণ সম্প্রতি আবি®কৃত হয়েছে লজেন্স বা চকলেট হার্টের জন্য বিশেষ উপকারী। আবার চুইনগাম খেলে মস্তিষ্ক তীক্ষè (Sharp) হয়। তবে চুইনগামের মধ্যে ভালো মন্দ আছে। তদুপরি চুইনগামে বর্তমানে শরীরের জন্য উপকারী কিছু ভিটামিন, খনিজ, ঔষধি গুণ সম্পন্ন উপাদান দেয়া হয়। যারা ক্রিকেট খেলেন তাঁদেরতো প্রায় সব সময়ই চুইনগাম চিবুতে দেখা যায়। তবে কেন শিশুদের এ থেকে বিরত রাখা হবে? অবশ্য এর একটা তীব্র কারণও আছে। আর তা হল শিশুরা এগুলো চিবিয়ে মুখে স্বাদ অনুভব করে ফলে মুখ না ধুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে এবং দাঁতের ক্ষতি হয়। এদের এগুলো থেকে বিরত না রেখে শিশুদের দাঁতের যতœ নিতে হবে। শিশুরা যেন মিষ্টিজাতীয় খাদ্য খেয়ে মুখ না ধুয়ে না ঘুমায় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। শিশুদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে যেন মিসওয়াক করে দাঁত পরিষ্কার করে। এতে অনিহা প্রকাশ করলে নরম কাপড় ভিজায়ে অথবা মিসওয়াক অন্য কেউ চিবায়ে নরম করে দিয়ে ধীরে ধীরে পরিষ্কার করতে হবে। দাঁতের মাজন যেন ব্যবহার না করে কারণ তাতে যে উপাদান থাকে তার ঘর্ষণে শিশুদের দাঁতের ফ্লুরাইড নষ্ট হতে পারে। আবার আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে শিশুরা যেন টুথপেস্ট মুখে না রেখে, ফিডারের বোতল যেন মুখে না নিয়ে ঘুমায়। হেল্থ এডুকেশন অথোরিটি’র অনুমোদন অনুযায়ী শিশুদের ব্রাশের মাথার মাপ নিতে হবে ২০ মিলিমিটার ১০ মিলিমিটার। শিশু একটু বড় হলে বেবী ব্রাশ দেয়া যেতে পারে তবে মিসওয়াকই উৎকৃষ্ট। শিশুদের বয়স যখন ২ বছর পেরুবে তখন থেকে তাদের নিজ উদ্দ্যগে মিসওয়াক করার অভ্যাস গড়াতে হবে। এজন্য এভাবে তাদের সাথে কথা বলা যেতে পারে, ‘তোমার দাঁতে ময়লা জমেছে, দেখতে বিচ্ছিরি লাগছে, মুখ দিয়ে গন্ধ বের হচ্ছে, চলো মুখ ধুয়ে নাও। না হলে তোমার সাথে কথা বলব না’। তাহলেই দেখা যাবে শিশুটি নিজ উদ্দ্যগেই দাঁত পরিষ্কার করা শুরু করেছে। কারণ শিশুরা স্বভাবতই আদরপ্রিয়। আর মিসওয়াকের অভ্যাস গড়াতে মায়েদেরই ভূমিকা বেশি। কারণ মায়েদের মতো কোমল, নিরাপদ আশ্রয় শিশুরা অন্য কারো কাছে পায় না। তবে সেই সাথে আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, তা হলো তাদের সামনে বেশি না বোধক শব্দ উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা শিশুদের সামনে বেশি না বোধক শব্দ ব্যবহার করলে তাদের মধ্যে সব বিষয়ে নেগেটিভ ধারণা জন্মায়।
শিশুর দাঁতের যতেœ অপরিহায্য আরেকটি বিষয় হল সুষম খাদ্য। স্থায়ী দাঁত না উঠা পর্যন্ত খাদ্য তালিকায় ভিটামিন ‘সি’ ও ভিটামিন ‘ডি’ জাতীয় খাদ্য রাখতে হবে। বয়স বাড়তে থাকলে যখন স্থায়ী দাঁত উঠবে সে সময় খাদ্য তালিকায় ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ‘সি’, ভিটামিন ‘ডি’, জাতীয় খাদ্যসমৃদ্ধ খাদ্য রাখতে হবে। তবে নিয়মিত মিসওয়াক করালে তা থেকে এসব উপাদান সহজে লাভ হয়। এক্ষেত্রে কবর স্থানের গাছের মিসওয়াক ব্যবহার করলে এসব উপাদান প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
সবশেষে একটি সতর্কবাণী না রেখে বিষয়টি ত্যাগ করা উচিৎ মনে করছি না। তা হল আমরা অধিকাংশ সময় শিশুদের শান্ত রাখতে সফট ড্রিংকস (Soft drinks) দেই যেমন আরসি কোলা (R C Cola), পেপসি (Pepsi), কোকা কোলা (Coca Cola), ডায়েট সফট ড্রিংক (Diet soft drink) ইত্যাদি। এসব ড্রিংক এ প্রচুর পরিমাণে স্যাকারিন (Saccharin) ব্যবহৃত হয়। যা দাঁতের জন্য ক্ষতিকরতো অবশ্যই। সাথে ইহা ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। ইহার ফলে দৃষ্টি শক্তি কমে যেতে পারে, হার্টের রোগ, পাকস্থলিতে অ্যাসিডিটি, কিডনি প্রভৃতির ক্ষতি হতে পারে। আরও অনেক ক্ষতি আছে যা বিষয়বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত না হওয়ায় তুলে ধরা হল না।
শিশুদের দাঁতের যে কোন সমস্যার জন্য সরাসরি অভিজ্ঞ ডাক্তারের স্বরনাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। শিশুদের অবিন্যস্ত দাঁত থাকলে তা দন্তচিকিৎসকের মাধ্যমে তুলে ফেলা উচিৎ। নইলে এতে দাঁতের ক্ষয়রোগ, মাড়ি ফুলে যাওয়া, মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, মুখে ঘা হওয়া, দাঁত নড়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।

ছাত্র / ছাত্রীদের জন্য মিসওয়াক ঃ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির সময় হল ছাত্র জীবন বা তরুণ বয়স। ১০-১২ বছর বয়সি যবা বা ছাত্র/ছাত্রী একটু উদাসীন থাকে ফলে দাঁতের যতœ নেয় না। ফলে এই সময়ে দাঁতের ক্ষতি সাধন হয় বেশি। পান, বিড়ি, সিগারেট, সফট ড্রিংকস, অ্যালকোহল প্রভৃতি ব্যবহার করার পর দাঁতের জন্য কিছু করা হয় না। ফলে এতে দাঁতের ক্ষতি হয়। এতে পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটে যার ফলে ছাত্র জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে প্রথমে বেঁচে থাকা পরে সুস্থতা এবং জীবিকা নির্বাহ করা। আর বাঁচতে হলে মুখ তথা দাঁত পরিষ্কার রাখতে হবে। এই বয়সে তরুণ তরুণীদের হাঁসির মূল্য অনেক। এ বয়সে মুখে হাঁসি না থাকলে শিক্ষক, সহপাঠী, বয়স্ক লোক, ছোট কারো কাছে মুল্য পাওয়া যায় না। একটি মিষ্টি হাঁসি জগতের সকল কষ্ট, শত্র“তা ভুলাতে পারে। সুতরাং নিয়মিত মিসওয়াক করা বা দাঁত পরিষ্কার করা জরুরী। এ ছাড়া সকল আলোচনার শেষে একজন শিক্ষার্থী অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে যে মিসওয়াক খুবই জরুরী বিষয়। তাই এ আলোচনা আপাতত এখানে সমাপ্ত।

বয়স্ক লোকের জন্য মিসওয়াক ঃ আপনার ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চাকে কোলে তুলে চুমু খেয়ে আদর করতে গেলেন অথবা ছোট নাতি নাতনীকে বুকে টেনে নিয়ে গল্প শোনাতে চাইলেন অথচ বাচ্চাটি এই বলে দৌড় দিল যে, ‘উহ! কি গন্ধ!’ তখন আপনার কেমন লাগবে? মনে কি হবে না যে আপনার হৃদয় ছিড়ে, দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে খানখান হয়ে যাচ্ছে? এই একটি বিষয় মনে করলেই বয়স্কদের জন্য মিসওয়াক করার জন্য আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি। পান খাওয়া বয়স্কদের একটা নেশা। তবে পান একটি পাচক। পানের সাথে খয়ের, সুপারী, আদা খাওয়া যেতে পারে কিন্তু চুন খাওয়া উচিত নয়। কারণ চুন মিষ্টি জাতীয় বস্তুর সাথে বিক্রিয়া করে পেটে পাথর সৃষ্টি করতে পারে। খয়ের ঠান্ডাকারক ও হজম বৃদ্ধিকারক। এটি গলা, মুখ ও মাড়ির ঘা জনীত অসুবিধায় ও ডায়রিয়ায় (Astringent হিসাবে) ব্যবহৃত হয়। সুপারী অপক্ক ও অশুষ্ক হলে তা যৌন দূর্বলতা, মুত্রনালীর অসুখ, স্নায়বিক দূর্বলতা ও স্থবিরতা (Paralysis) চিকিৎসায় ফলপ্রসু ভূমিকা পালন করে। আদা সুগন্ধি বায়ুনাশক (Carminative) ঔষধ হিসাবে, পেট ফাঁপা, ব্যথা, বমি, সর্দি, কাশি, হাপানী, স্বরভাঙ্গা, গলা ব্যথা, গেটে বাত ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়। পানের সাথে বা অন্যভাবে কোন ভাবেই তামাক পাতা গ্রহণ করা যাবে না। তামাকে নিকোটিন থাকে প্রায় ০.৬ থেকে ৯.০ শতাংশ পর্যন্ত। এটি তরল বিষাক্ত উপক্ষার বা অ্যালকালয়েড। ইহার ফলে বা প্রয়োগে বা ব্যবহারে কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্রে (Center nervous system) প্রথমে সাময়িক উত্তেজনা জাগায়। পরে তা কমে দমিত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিষাদগ্রস্থতার (Depression) জন্ম দেয় এবং সর্বশেষে পক্ষাঘাতের (Paralysis) সৃষ্টি করে। এটি মাংস পেশীর পক্ষাঘাত গ্রস্থতারও সৃষ্টি করে। ১.০ গ্রাম নিকোটিন কোন সুস্থ ব্যক্তির রক্ত প্রবাহে অনুপ্রবেশ করালে ১.০ মিনিটের মধ্যে লোকটির মৃত্যু ঘটবে। সুতরাং পান খাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। শুধু তাই নয় পান খাওয়ার পর মিসওয়াক দিয়ে অতি উত্তম রুপে দাঁত পরিষ্কার করতে হবে। নইলে দাঁতের রোগে ভূগতে হবে।

গর্ভবতী মহিলাদের জন্য মিসওয়াক ঃ মহিলাদের বিশেষ কিছু সময় প্রাকৃতিক কারণেই দাঁতের কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন বয়ঃসন্ধি, ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা, মেনোপজ বা রজঃনিবৃত ইত্যাদি। এসব সময় দাঁতের সমস্যার চিকিৎসা করা জরুরী। গর্ভাবস্থায় পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরী। গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়াম খেলে ভূমিষ্ট শিশুর দাঁত পরবর্তীতে সুস্থ সবল হয়ে গজায় এবং স্থায়ী হয়। গর্ভবতী মায়েদের শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন না থাকলে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাদের অস্তিওম্যালেসিয়া রোগ বেশি দেখা দেয়। ক্যালসিয়ামের অভাবে তাদের অস্থিকোটরের হাড় বিকৃত হয়। ফলে প্রসবকালে বেশ কষ্ট হয়। এ সময়টা একটা নারীর জন্য যেমন একদিকে চরম আনন্দের যা অনাগত সন্তানের মুখ দেখার জন্য, তেমনি অতি উত্তেজনা ও উৎকন্ঠার সময় কালও এটি। এই চিন্তার ও আনন্দের মিশ্রণের সময়ে দাঁতের বিশেষ যতœ নিতে কতিপয় বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।
গর্ভাবস্থায় অনেক মহিলার দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ে যাতে তারা উৎকন্ঠিত বোধ করেন। এতে ভয়ের কিছু নেই। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন হয় ফলে এই প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া দাঁতের মাড়িতে দেখা দিতে পারে। আবার উত্তেজনে (Irritation) বা উপদাহে মাড়ি খুব সংবেদী (Sensitive) হয় ফলে খুব সহজে রক্তপাত ঘটে। একে গর্ভাবস্থার মাড়ি প্রদাহ বা Pregnancy gingivitis বলা হয়। এই সমস্যা নিরসনের জন্য নিয়মিত মিসওয়াক দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন এ সময় ডেন্টাল প্লাক (Dental pluk) তৈরি না হয়। যদি এ সমস্যা হঠাৎ সৃষ্টি হয়েই বসে তবে গর্ভ এবং দাঁত সম্পর্কে ভালো জানেন এমন ডাক্তারের মত অনুযায়ী চিকিৎসা করা প্রয়োজন। কেননা এই রক্ত পেটের ভিতরে প্রবেশ করে আগত সন্তান সহ গর্ভবতী মায়ের ক্ষতি করতে পারে। (মিসওয়াকের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োজনীয়তা অংশে দ্রষ্টব্য)।
আহারের মধ্যবর্তী সময়ে শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহণ না করাই শ্রেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে শর্করা জাতীয় খাদ্য একেবারেই গ্রহণ করা যাবে না। খাদ্য তালিকায় যাতে স্বল্প পরিমাণে শর্করা জাতীয় খাদ্য থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এতে দাঁতের ক্ষয়রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হবে এবং দেহের বাড়তি ওজনে নিয়ন্ত্রণ রক্ষা পাবে। শিশু পেটে আসলে দাঁতের ক্যালসিয়াম শিশুর দাঁতে চলে যায় না। তবে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খেলে তা শিশুর দাঁতের ও স্বাস্থ্যর উপর প্রভাব ফেলে। এজন্য প্রতিটি গর্ভবতী মহিলার জন্য পেয়ারা, কলা, লেবু, শশা, আলু, গাজর, টমেটো, ঝিঙ্গা জাতীয় খাদ্য বেশি পরিমাণে খেতে হবে।

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন আবুল বাশার আল কলি (2012-February-02 11:04(am))

আপনার আমন্ত্রণ রইল আমাদেরে এলাকায় মন্তব্য করা ও কিছু লিখার জন্য চলনবিল

জবাব: ধারাবাহিক : মিসওয়াকের মহাবিস্ময়কর রুপ (১০ম পর্ব)

এই পর্বটিও ভালো লাগলো ।

http://s7.postimage.org/jd5k2og6v/702174_447944615269126_1968962762_n.jpg