টপিক: ধারাবাহিক : মিসওয়াকের মহাবিস্ময়কর রূপ (পর্ব-১১)

কখন মিসওয়াক করতে হয়, কেন
১. নামাযের পূর্বে বা ওজুর পূর্বে : মুসলিম রীতি অনুযায়ী প্রত্যেক নামাযের ওয়াক্তের পূর্বে মিসওয়াক করা সুন্নত। তবে তা ওজু করার পূর্বে। হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই নিদ্রা যেতেন রাতে বা দিনে, অতপর জাগতেন, তখন ওজু করার পূর্বেই মিসওয়াক করতেন। (আহমদ, আবু দাউদ, মিশকাত)।
আবার অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত আছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি যদি আমার উম্মতের জন্য (অথবা লোকদের জন্য) কঠিন (কষ্টকর) মনে না করতাম তবে প্রত্যেক নামাযের ওয়াক্তেই (আবশ্যকীয় হিসাবে) মিসওয়াক করার হুকুম দিতাম। (বোখারী, রিয়াদুস সালেহীন, মিশকাত, মুসলিম, হাদিস শরীফ)।
আবু দাউদ ও মিশকাত শরীফের সাথে এটুকু যুক্ত আছে যে ‘ঈশার নামায পিছাইয়া পড়িতে হুকুম দিতাম’। অর্থাৎ যেহেতু ঈশার নামায পর ঘুমানোর নিয়ম তাই ঈশার নামায পড়ার পূর্বে মিসওয়াক করা ফরয হয়ে যেত। আমাদের দরদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে, অত্যন্ত দয়া পরবশ হয়ে প্রত্যেক নামাযের পূর্বে ফরয হিসাবে মিসওয়াক করার বাধ্যবাধকতা স্থির করেন নি। তবে তিনি কেন এমনটি করলেন তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
ক) আমরা ঈমানের দিক দিয়ে তখনকার তুলনায় অনেক, অনেক, অনেক দূর্বল।
খ) আমরা দাঁতের মর্যাদা সম্পর্কে খুবই কম জ্ঞাত যা না জানার শামিল।
গ) দাঁতের বাহুবল থাকে প্রায় চলি¬শ বছর পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে দাঁত সাধারণত পড়ে যায় না বলে এ সম্পর্কে অনীহা ইত্যাদি। সুতরাং নামাযের পূর্বে তথা ওজুর পূর্বে আমাদেরকে মিসওয়াক করতে হবে।

২. বাহির থেকে ঘরে ফিরে ঃ আমরা যখন বাহিরে যাই তখন অনেক কিছুর সাথে খাপ খাওয়াতে হয়। এসব করতে গিয়ে আমাদের মুখে ধুলাবালি, ময়লা আবর্জনা, জীবাণু, বিভিন্ন ক্ষতিকর ধাতব পদার্থ বা কণা (চধৎঃরপষবং) ইত্যাদি মুখের ভেতর প্রবেশ করে যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সুতরাং ক্ষতিকর বস্তুগুলোকে অবশ্যই বিতাড়িত করা প্রয়োজন। এজন্য মিসওয়াক অপরিহায্য। এ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি হাদিস উলে¬খ করার মতো- হযরত আয়িশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাহির থেকে এসে বাড়ীতে ঢুকেই সর্বাগ্রে মিসওয়াক করতেন। (মুসলিম)।

৩. রাস্তায় চলাচলের পর ঃ রাস্তায় চলাচলের সময় অনেক সময় আমরা হাই তুলি, মুখ ও নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নেই কিংবা একটু দূরবর্তী কারো সাথে কথা বলি বা মুখ একটু হা করে থাকি। এ সময় রাস্তার বিভিন্ন ধুলিবালি এবং ধুলিবালি সংলগ্ন ক্ষতিকর জীবাণু, বিষাক্ত পদার্থ (অনেক সময় রাস্তায় সাপ বা এ জাতীয় বিষাক্ত জীব গাড়ির চাকায় বা অন্য ভাবে পিষ্ট হয়ে মারা যায়। এগুলো শুকিয়ে গিয়ে বা পচে গিয়ে মাটির সাথে মিশে যায় এবং পরে তা আমাদের শরীরের ভিতরে নাক, মুখ, চামড়া প্রভৃতি দিয়ে প্রবেশ করে), যানবাহনের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া (এ ধোঁয়ার সাথে অনেক সময় বিষাক্ত ধাতব পদার্থের কণা বের হয়), ঝড়ো হাওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে আমাদের দেহ অভ্যন্তরে বিষাক্ত বস্তু প্রবেশ করে। আবার অনেক সময় দাঁতের উপরে আটকে যায়। এসব বিষাক্ত জীবাণু নাক ও মুখ দিয়েই বেশি প্রবেশ করে। সুতরাং আমরা রাস্তায় চলাচলের পর ঘরে ফিরে মিসওয়াক করলে এ সব জীবাণু সহজে আক্রমন করতে পারে না। যেহেতু মিসওয়াক করলে মুখের সাথে নাক চোখও ধুয়ে ফেলি তাই সেই সব জীবাণুর হাত থেকে সহজেই রক্ষা পেতে পারি। বাহির থেকে ঘরে ফিরে মিসওয়াক করা সম্পর্কে একটি হাদিস হল- হযরত শারাহ বিন হানী বর্ণনা করেন, আমি হযরত আয়িশা (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গৃহে প্রবেশ করে সর্ব প্রথম কোন কাজ করতেন’? তিনি উত্তর দিলেন, ‘মিসওয়াক করতেন’। (রিয়াদুস সালেহীন, মিশকাত, মুসলিম)।

৪. ঘর বাড়ি পরিষ্কারের পর ঃ ঘর বাড়ি ঝাড়– মোছার সময়, গোয়াল ঘর, বাসা বদল করে নতুন বাসায় উঠার সময় মুখের ভেতর ধুলি-বালি, জীবাণু মুখ দিয়ে দেহ অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। কিছু অংশ দাঁতের আঠালো পদার্থের সাথে আটকে থাকতে পারে। সুতরাং কাজ শেষে মিসওয়াক করে নিলে এ সব ক্ষতিকর বস্তু থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

৫. কৃষি কর্মের পর ঃ কৃষি কাজ করার সময় অর্থাৎ ফসল মাড়াই, ঘরে তোলা, জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ, বিভিন্ন ফলের গাছে কীটনাশক প্রয়োগ ইত্যাদি কারণে মুখে ক্ষতিকর বস্তু প্রবেশ করতে পারে। সুতরাং কাজ শেষে মিসওয়াক করা জরুরী।

৬. খাবার পূর্বে ও পরে ঃ প্রত্যেক নামাযের পূর্বে যদি মিসওয়াক করা হয় তাহলে খাবার পূর্বে মিসওয়াক না করলেও চলে। এ ক্ষেত্রে ভালো করে কুলি করলে এবং আঙ্গুলকে মিসওয়াকের মতো ব্যবহার করলেই হবে। তবে খাবার পরে মিসওয়াক করা জরুরী। খাবার পর মুখে বা দাঁতে তৈলাক্ত পদার্থ লেগে থাকলে অতি সহজেই জীবাণু তাতে আটকে যায়। আবার মিষ্টি জাতীয় খাদ্য দাঁতের ক্ষতি করতে পারে কিংবা দাঁতের ফাঁকে খাদ্য কণা জমে দাঁত, মুখ, মাড়ি প্রভৃতির ক্ষতি করতে পারে। সুতরাং খাবার পরে অবশ্যই দাঁতে মিসওয়াক করতে হবে। তবে টক জাতীয় খাবার গ্রহণের পরপরই মিসওয়াক বা ব্রাশ না করাই ভালো এবং উচিৎ। এতে দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৭. ঘুমানোর পূর্বে ঃ ঘুমানোর পূর্বে মিসওয়াক করলে সারাদিন যে সব জীবাণু দাঁতে, দাঁতের ফাঁকে, দাঁতের গোড়ায়, চোয়ালে, মুখের ভেতর জমে থাকে তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ফলে এ সব জীবাণু আক্রমণ করতে পারে না। দাঁতের যন্ত্রণা হয় না এবং প্রশান্তির একটা ঘুম দেয়া যায়। আবার অনেক সময় দাঁতের ফাঁকে শক্ত খাদ্য কণা জমা হয় বা আটকে যায় ফলে আমরা জিহ্বা দ্বারা বের করার চেষ্টা করি। অথবা হাতের কাছে সুঁচালো যা পাই তাই দিয়ে বা অধৌত হাত দিয়ে, অনেক সময় বাম হাত দিয়ে সেসব বের করার চেষ্টা করি। যার ফলে অনেক জীবাণু হাত দ্বারা মুখে এবং শেষে দেহ অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। যা আমাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। সুতরাং ঘুমানোর পূর্বে মিসওয়াক (সাথে খিলাল বা ডেন্টাল ফ্লসিং) করলে এসব ক্ষতিকর বিষয়কে সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। আরেকটি কথা না বললেই নয়, রাসুল সাল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম যেহেতু ঈশার নামাযের পরই ঘুমাতেন তাই ঘুমের পূর্বে মিসওয়াক করা সম্পর্কে কোন হাদিস আছে বলে আমার জানা নেই। এখানে এটা এজন্য উলে¬খ করলাম যে অনুসন্ধানী ব্যক্তিবর্গের বা অস্বীকারকারীদের মনে জিজ্ঞাসা বা সন্দেহ জাগতে পারে। ঘুমের পূর্বে ঈশার নামায, তৎপূর্বে ওজু, তৎপূর্বে মিসওয়াক এরকমই কথা। অধিকাংশ ডাক্তার রাতে শোবার পূর্বে মিসওয়াক করার পেছনে যে যুক্তি দেন তা হল- শয়নকালে মানুষের দাঁত বেশি নষ্ট হয়। কারণ হল মানুষ দিনের বেলায় কথা বলে, খাদ্য গ্রহণ করে, পান করে তাই দিনের বেলায় মুখের গতিশীলতার কারণে রক্তমস্ত ও রক্তলসিকা তার কাজ করার সুযোগ পায় না। আর রাতের বেলা মুখের এরুপ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। খানা খাওয়ার পর মিসওয়াক করলে দাঁতের রোগ হয় না। খাদ্য খাবার পর মিসওয়াক সহ ওজু করে নামায পড়ে ঘুমাতে গেলেই সমাধান হয়ে গেল।

৮. ঘুম থেকে উঠে ঃ দাঁতের যতœ নেয়া বিষয়ক একটি বইয়ের লেখক বইটির ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘আমাদের অনেকেই সকালে নাস্তার পূর্বে দাঁত ব্রাশ করি। কিন্তু সঠিক নিয়ম হচ্ছে সকালে নাস্তার পর ------------ দাঁত ব্রাশ করতে হবে’। এ দুটি লাইনের মধ্যে প্রথম লাইন সমর্থন যোগ্য কিন্তু পরের অংশ তিনি কেন এমন লিখলেন তা আমার বোধগম্য নয়। কারণ হাদিস শরীফে স্পষ্ট সকালে ঘুম থেকে উঠার পর মিসওয়াক করার নিয়ম আছে এবং বিজ্ঞানও তাই বলে। হযরত হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে যখন ঘুম থেকে উঠতেন তখন মিসওয়াক দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতেন’। (বোখারী শরীফ, রিয়াদুস সালেহীন)।
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যবহারের জন্য ওজুর পানি ও মিসওয়াক রাখা হত। অতপর রাতে ঘুম থেকে উঠার পর তিনি প্রথমে প্রস্রাব পায়খানা করতেন, পরে মিসওয়াক করতেন। (আবু দাউদ)।
এরকম আরো কয়েকটি হাদিস বর্ণিত আছে যা ‘মিসওয়াক সম্পর্কে হাদিসের বাণী’ অংশে দেয়া আছে।
সারা রাত্রি ঘুমানোর সময় নিঃশ্বাসের সাথে বায়ুস্থিত ধুলি-ময়লা, জীবাণু প্রভৃতি মুখে যেতে পারে। সারা রাত মুখের ভেতরের খাদ্য কণা, দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্য কণা প্রভৃতি জমে গিয়ে পচন ধরে। যার ফলে সকালে উঠে মিসওয়াক না করলে সেসব পচনশীল খাদ্য কণা পেটের ভেতর প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির সহায়ক শক্তি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। এজন্য সকালে ঘুম থেকে জাগার পর মিসওয়াক করা উচিত।
(পূর্বে উল্লেখিত বইয়ে অবশ্য ২১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ‘বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ও রাতে ঘুমাতে যাবার আগে দাঁত পরিষ্কার করা উচিত। এটা কম্পোজের সময় ভুল হতে পারে যা অসম্ভব কিছু নয়। সচরাচর লেখকগণ যে ভাবে প্রারম্ভে ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি তা করেন নি তাই ধারণা করতে পারি তিনি এ ব্যাপারে দ্বৈত মত প্রকাশ করেছেন)।

৯. কুরআন মাজীদ ও হাদিস শরীফ তিলাওয়াত করার পূর্বে : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের উচিত মিসওয়াক করা। কারণ ইহা মুখ পবিত্রকারী, রব্বের (আল্লাহর) সন্তুষ্টি বিধানকারী, ফিরিশতাদের আনন্দ দানকারী, নেকী বাড়ায় এবং সুন্নতের মধ্যে গণ্য। দায়লামীর বর্ণনায় বাড়তি আছে যে, ইহা শয়তানের রাগ আনয়নকারী। আমরা এখান থেকে জানতে পারছি মিসওয়াকে মুখ পবিত্র হচ্ছে, এবং আল্লাহ পাক সন্তুষ্ট হচ্ছেন তাই পবিত্র মুখ নিয়ে আল্লাহ পাকের কালাম আর আল হাদিস পাঠ করার পূর্বে মিসওয়াক করলে আল্লাহ পাক খুব খুশি হবেন। ইহা করলে শয়তান রেগে যায় ফলে শয়তান চলে গেলে মনোযোগ বাড়ে এবং ফ্রেশ মনে পড়া যায়।
এছাড়া যে সব সময় মিসওয়াক করা দরকার, মুখের স্বাভাবিকতা বিকৃত হওয়ার পর, ওযুতে কুলি করার সময়, সালাতে দন্ডায়মান হওয়ার সময় (অর্থাৎ সালাত শুরুর আগে), কুরআন মাজীদ, হাদিস শরীফ তিলাওয়াত করার পূর্বে, ঘরে প্রবেশ ও মজলিসে যাওয়ার সময়, গোসলের সময়, দাঁত অপরিষ্কার হলে ইত্যাদি।
সালাতে অপেক্ষাকারীর মিসওয়াক করাতে কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু খোতবা চলাকালীন মিসওয়াক করা যাবে না। কারণ এতে খুতবা শোনা থেকে বিরত রাখবে। কিন্তু তন্দ্রা কাটানোর জন্য প্রয়োজনে মিসওয়াক ব্যবহার করতে কোন দোষ নাই (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)।

আপনার আমন্ত্রণ রইল আমাদেরে এলাকায় মন্তব্য করা ও কিছু লিখার জন্য চলনবিল

Share

জবাব: ধারাবাহিক : মিসওয়াকের মহাবিস্ময়কর রূপ (পর্ব-১১)

চমত্কার হয়েছে এই পর্বটি ।এগিয়ে যান ।এই ধারাবাহিকে আমি অবশ্যই আছি ।

Share

জবাব: ধারাবাহিক : মিসওয়াকের মহাবিস্ময়কর রূপ (পর্ব-১১)

চমত্কার লাগল এই ধারাবাহিকটি ।আশা করি সব সময় এমন কিছু লেখা পাব আপনার কাছ থেকে ।

দেশান্তরী..