টপিক: ধারাবাহিক : মিসওয়াকের মহাবিস্ময়কর রুপ (পর্ব ১৬)

মিসওয়াক করা কখন উচিৎ নয়

ক) টক জাতীয় খাদ্য গ্রহণের পর : আমরা প্রচুর পরিমানে টক খেতে পছন্দ করি। বিশেষত মেয়েরা টক বলতে পাগল। শুধু কি তাই কাউকে টক খেতে দেখলে অধিকাংশের জিহ্বায় পানি এসে যায়। টক জাতীয় খাদ্য খেলে দাঁতের সংবেনশীলতা কমে যায় ফলে দাঁত শিরশির করে। দাঁতের এনামেলের সাথে এটি সম্পর্কিত। টক জাতীয় খাদ্য খাওয়ার পরপরই মিসওয়াক করলে দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

খ) শোয়া অবস্থায় : শোয়া অবস্থায় মিসওয়াক করা মাকরুহ। (ফতোয়ায়ে আলমগীরি)। আমরা মূলত মিসওয়াক করি দাঁতকে বা মুখের ভেতর পরিষ্কার করার জন্য। দাঁত পরিষ্কার সময় যদি শুয়ে থাকি তাহলে থুথুর সাথে ময়লা জীবাণু অনায়াসেই পেটের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। ফলে কেঁচো খুঁজতে গিয়ে সাপ বেড়িয়ে আসার মতো হতে পারে। এজন্য শোয়া অবস্থায় মিসওয়াক করা উচিৎ নয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুবিধা অনুভব করলে কোলে হেলান দিয়ে মিসওয়াক করেছেন। (বোখারী, বিশ্বনবীর জীবন কথা)। তাছাড়া শোয়া অবস্থায় মিসওয়াক করার কারণে প্লীহা বড় হতে পারে (আইনি তুহ্ফা সলাতে মুস্তফা)।

গ) রাস্তায় হাটা অবস্থায় : আমরা মিসওয়াক করার সময় স্থির থাকি খুব কম সময়ে। এমনটি করা উচিৎ নয়। বিশেষ করে রমজান মাসে আমরা রাস্তা দিয়ে হাঁটি এবং দীর্ঘ সময় মিসওয়াক করি। রাস্তা দিয়ে হাঁটা অবস্থায় মিসওয়াক করলে পায়ের চলন গতিতে অনেক সময় বাধা পেয়ে মিসওয়াক দাঁতের মাড়িতে আঘাত করতে পারে এবং রক্ত বের হতে পারে। যার ফলে সেখানে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ীর ধোঁয়া, জীবাণু যুক্ত বাতাস ও অন্যান্য জীবাণু চলন্ত অবস্থায় মিসওয়াক করলে তা মুখ দিয়ে দেহ অভ্যন্তরে প্রবেশ করে শরীরের ক্ষতি করতে পারে।

ঘ) যানবাহনে যাত্রী বা চালক হয়ে : যানবাহনে বেশিরভাগ সময় ঝাঁকুনি সৃষ্টি হয়, উঁচু নিঁচু স্থানে গাড়ী উঠানামা করার সময় ঝাঁকুনি লাগে তখন মিসওয়াক করতে থাকলে (গ অংশে দ্রষ্টব্য) দাঁতের ক্ষতি হতে পারে। তাছাড়া চালক অবস্থ্ায় মিসওয়াক করতে থাকলে এক্সিডেন্ট সম্ভাবনা সৃষ্টি করে যা চালক এবং যাত্রীর জন্য মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

ঙ) বিভিন্ন ধরনের কাজ করার সময় : আমরা অনেক সময় মিসওয়াক করতে করতে অন্য কাজও করি। যেমন মিসওয়াক মুখের মধ্যে দিয়ে লেখালেখি করি, ঘর-দোর ঝাড়-মোছ করি এবং অন্যান্য বহুবিধ গৃহস্থালী কাজ করি। এর ফলে মিসওয়াকের প্রতি অনিহা আসে বা অমনোযোগ আসে। কখনও কাজ সম্পাদন কালে দ্রুত মিসওয়াক দাঁতের সাথে ঘষা দেই যা দাঁতের জন্য ক্ষতিকর।

চ) নামাযে দাড়িয়ে : অনেকে এমন রয়েছেন কানের সাথে মিসওয়াক রাখেন এবং নামাযে দাড়িয়ে মিসওয়াক দিয়ে দাঁতে দু’বার ডানে বামে ঘষা দিয়ে (নামাযের নিয়াত করে) নামায শুরু করেন। প্রথমটি ভালো হলেও দ্বিতীয়টি মোটেই গ্রহণ যোগ্য নয়। মূলত এ কাজটি করা হয় অজ্ঞানতা বশত। আমার মনে হয় উনারা নিম্মোক্ত হাদিসের অনুসরণ করতে চান।

হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, (যে) নামাজ মিসওয়াক সহকারে আদায় করা হয় তার ফজিলত, মিসওয়াক বিহীন আদায়কৃত নামাযের তুলনায় সত্তর গুণ বেশি। (মিশকাত, আহমাদ, বায়হাকী)।

অন্যত্র বর্ণিত আছে, সত্তরগুণ উত্তম ও অধিক সওয়াবের অধিকারী। (হাদিস শরীফ, তিরমিযি, মিশকাত)।

যায়িদ ইবনে খালিদ আল্ যুহনী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যদি আমি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তবে তাদেরকে প্রত্যেক নামাযের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।
আবু সালমা (রহঃ) বলেন, অতপর আমি যায়িদ (রাঃ) কে মসজিদে এমত অবস্থায় বসতে দেখেছি যে, মিসওয়াক ছিল তার কানের ঐ স্থানে যেখানে সাধারণত লেখকের কলম থাকে। অতপর যখনই তিনি নামাযের জন্য দাড়াতেন মিসওয়াক করে নিতেন। (আবু দাউদ, তিরমিযি, মিশকাত)।

প্রথম হাদিসে এরুপ কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, নামাযের (নিয়াতের) পূর্বেই মিসওয়াক করতে করতে হবে। দ্বিতীয় হাদিসও এটা প্রমাণ করে না যে, নামাযে দাড়াতেন পূর্বে মিসওয়াক করতেন অথচ কুলি করতেন না। নামাযের জন্য দাড়ানো বলতে নামাযের পূর্ব প্রস্তুতিও বুঝানো হয়। প্রথমত যে কথাগুলো পরিষ্কার হওয়া দরকার তা হল উক্ত হাদিসদ্বয়ের কোনটিই প্রমাণ করে না নামাযের মধ্যে মিসওয়াক করতে হবে। (যা অনেকে করেন বলে শোনা যায়)। নামাযে এরুপ করাটা মূলত অজ্ঞানতা, হাস্যকর বা বেমানান। আমাদের সামনে অনেক হাদিস আছে যেখানে স্পষ্ট উলে¬খ আছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের পূর্বে ওজু করতেন আর ওজুর পূর্বে মিসওয়াক করতেন। (মিসওয়াক সম্পর্কে হাদিসের বাণী অংশ দ্রষ্টব্য)। প্রথমে ভাবতে হবে আমরা মিসওয়াক করি কেন? অনেক কারণের মধ্যে এখানে দু-চারটি উল্লেখ করলাম।
ক) দাঁত পরিষ্কার করতে;
খ) ময়লা জীবাণু যাতে দাঁতে মুখে না লেগে থাকে;
গ) দাঁতের ফাঁকে যেন অপ্রয়োজনীয় বস্তু না থাকে ইত্যাদি।
এখন যদি নামাযের পূর্বে অর্থাৎ নামাযে দাড়িয়ে মিসওয়াক করে যদি নামাযের তাকবীর দিয়ে হাত বাঁধি তাহলে বলুনতো দাঁতের বা মুখের সেই সব ময়লা জীবাণু কোথায় যাবে? পেটের ভেতর নয় কি? মিসওয়াক করার ফলে যদি মুখে থুথু জমে যায় তাহলে থুথু কি করবেন? মসজিদের ভেতরে ফেলবেন? না। কারণ দুটিই আপত্তিকর, অরুচীকর, এবং অনুচিত। (অবশ্য এমনিতে যদি হঠাৎ থুথু জমে যায় এবং ফেলা জরুরী হয় তাহলে পায়ের তলে ফেলে বা কাপড়ে মুছে ফেলতে হবে)। সুতরাং নামাযের জন্য দাড়ানোর পূর্বে মিসওয়াক করে ভালো ভাবে দাঁত তথা মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। আরেকটি প্রশ্ন। নামাযের পূর্ব মুহুর্তে মিসওয়াক করে মুখ না ধুয়ে নিলে মিসওয়াকের যে নরম আঁশ দাঁতের ফাঁকে বা মুখের ভেতরে থাকবে তা কি নামাযে বিঘ্ন ঘটাবে না? নামাযে যা বিঘ্ন ঘটায় বা মনোযোগ নষ্ট করে তা কি ভালো হতে পারে? তাছাড়া কানের সাথে মিসওয়াক রাখলে চুলে লেগে থাকা জীবাণু ময়লা মুখে যাবেনা কি? সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় মিসওয়াক কানের পাশে থাক বা অন্যত্র তা ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই ধুয়ে নিতে হবে এবং মিসওয়াক শেষে কমপক্ষে কুলি করতে হবে।

একটি বিষয়ে সমাধান হওয়ার পর দ্বিতীয় আরেকটি বিষয়ে আসা যাক। অনেক উলামায়ে কিরামের মতে, ওজুতে কুলি করার পূর্বে মিসওয়াক করা উত্তম। (অনেকে ওজুতে কুলি করাকে প্রথম কাজ মনে করেন। তাই এটিও ওজুর পূর্বেই বলা যায়)। তবে আবার কোন কোন আলিম ওজু করার পূর্বে মিসওয়াক করার কথাও উল্লেখ করেছেন।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওজুর শুরুতে সব সময় মিসওয়াক করতেন। মিসওয়াক না থাকলে আঙ্গুল ব্যবহার করতেন। (আল হিদায়া, ই. ফা. বা. বঙ্গা. জানু-৯৮, ১ম খন্ড পৃষ্ঠা নং ০৬)।

হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই নিদ্রা যেতেন রাতে বা দিনে, অতপর জাগতেন, তখন ওজু করার পূর্বেই মিসওয়াক করতেন। (আহমদ, আবু দাউদ, মিশকাত)।

হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওজু করার পূর্বেই মিসওয়াক করতেন। এছাড়া আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রাত্যাহিক জীবন থেকে জানতে পারি, তিনি সকালে উঠে প্রথমে দুই হাত ধৌত করতেন, তারপর প্রস্রাব পায়খানা করতেন, এরুপে মিসওয়াক করতেন, ওজু করতেন, মাথায় চিরুনী করতেন, নামায আদায় করতেন ইত্যাদি।

ওজু করার পূর্বেই মিসওয়াক করার অরেকটি যুক্তি হল- ওজুর কয়েকটি সুন্নতের মধ্যে একটি হল ‘এক অঙ্গ শুকানোর পূর্বেই আরেক অঙ্গ ধুতে হবে’। এখন আমরা যদি ওজু শুরু করার পর চার কিংবা পাঁচ মিনিট মিসওয়াক করে নেই তাহলে ওজু করার সকল অঙ্গই শুকিয়ে যাবে। কেউ হয়তো বলতে পারেন চার পাঁচ মিনিট কেন শুধু ডানে একবার আর বামে একবার ঘষা দেব, ব্যস। তাহলে তো মিসওয়াক করার মূল লক্ষ্যই নষ্ট হয়ে গেল। সুতরাং পরিশেষে বলতে পারি ওজুর পূর্বে মিসওয়াক করাই শ্রেষ্ঠ।

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন আবুল বাশার আল কলি (2012-February-12 14:39(pm))

আপনার আমন্ত্রণ রইল আমাদেরে এলাকায় মন্তব্য করা ও কিছু লিখার জন্য চলনবিল

Share

জবাব: ধারাবাহিক : মিসওয়াকের মহাবিস্ময়কর রুপ (পর্ব ১৬)

খুবই ভাল লেগেছে ভাই ।চালিয়ে যান ।