টপিক: তেনারা

স্কুলে ছুটি পড়ায় ফুকলো দাদুর ঘরে রোজ টুকলোরা গল্প শুনতে যায়। দাদুর একটা দাঁতও নেই। কথাও কেমন ফুকফুকে ফুস !ফুস ! করে বেরোয়। তাই দাদু যখন রাজকুমার আর রাজকন্যার গল্প বলতে থাকেন ,তখন টুকলো মন সেখানে বসে না। তাও ও রোজ ছেলেদের সাথে দলবেঁধে আসে। আসারও কারণ আছে। দাদুর ঘরে রাজ্যের যত পুরনো জিনিস ! কারুকাজ করা জমিদারী খাট, পুরনো ইয়া পুরু নানা রঙের কাঁচের শিশি আর একটা মস্ত আলমারি ঘরে একপাশটায় কাই হয়ে দাড়িয়ে আছে। কালো কুচকুচে ,তেল চিটচিটে আলমারিটায় কি আছে কে জানে ? প্রায়ই খুকু কোমরে দু হাত দিয়ে আলমারিটায় সামনে গিয়ে দাড়ায়। আবছা অন্ধকারে , দূরে খাটের কিনারে রাখা কুপিটার ঝাপটায় আলমারিটাকে বড় অদ্ভুত দেখায় তখন। টুকলোর গাটা কেমন শিরশির করে উঠে।
দাদু ফোকলা মুখে হেসে বলেন , ওখানে কি করিস রে টুকলো ? গপ শুনবিনা ?
টুকলো বলে , এর মধ্যে কি আছি ফোকলা দাদু ?
দাদু টুকলোর কথা শুনে ফ্যাক ফ্যাক হেসে উঠেন। ও হাসি কেমন রূপকথার গল্পের ডাইনির মত দেখায়।
: ওর মধ্যে তেনারা থাকেন রে টুকলো ।
: তেনারা আবার কারা ?
দাদু এবার মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন , হু ! এই ভরসন্ধ্যায় তেনাদের নাম করি আর তেনারা রেগে আমার ঘাড় মটকে খাক আর কি !
ঘাড় মটকাবার কথা শুনে টুকলোও আর রা করেনা।

স্কুলে ছুটি চলছে ঠিকই। কিন্তু টুকলোর ছুটি নেই। ঘরটাই যেন একটা আস্ত স্কুল হয়ে উঠেছে। সকালে উঠে বাইরে বেরোতে গেলে বাবা বলেন , পড়া রেখে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি ? পরে বেরোবি এখন পড়তে বস!
শুনে আর ও কি করে , গাল ফুলিয়ে একটা বই খোলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে।
দুপুরে বেরোতে গেলো আবার বাঁধা। এবার বাবা নয় , মা।
চেঁচিয়ে বলেন , এখন ঘুমোবি ।ভরদুপুরে বাইরে গেলে অসুখ হবে ।
ধুৎ ছাই ! ছুটিটাই মাটি। কত কি করবে ভেবেছিল। কমলদের গাছে কেমন কামরাঙা পেকে টসটসে হয় আছে, লবণ দিয়ে হাজিদের দেয়ালে উঠে খেতে যা ভারি মজা হতোনা ।
নবু মামার পুকুর থেকে লুকিয়ে মাছ ধরারও এই উপযুক্ত সময়। ধুর ! যাকগে চুলোয় বাবা মায়ের শাসন। মা রান্না ঘরে রাঁধছিলো। তার সামনে দিয়েই এক ছুটে টুকলো বাড়ির বাইরে ।পেছন থেকে মায়ের চেচানো শুনতে পেল , ঐ দেখ বাদর ছেলে পালাল। বাড়ি আসিস ,ঠেঙিয়ে হাড় ভেঙে দেব ।
বড় সড়কের পাশ ঘেঁসে জংলা ঝুপের ভেতর দিয়ে একটা পায়ে হাটা পথ। সে পথ ধরে এক দৌড়ে এসে টুকলো থামে সুজনদের বাড়ির সামনে। জানালা দিয়ে সে ফিসফিসিয়ে ডাকে ,
: এই সুজন ..সুজন
: কে ?
: আমি টুকলো ।আয় ।
সুজন হাতে একটা আধগড়া ঘুড়ি নিয়ে জানালার আসে ।
টুকলো বলে , চল বেরোয় ।
সুজনের মুখ কালো হয়ে যায় । বলে , না ।
: কেন ?
: এখন তো ভরদুপুর !
: তো কি হয়েছে ? এখনই তো টসটসে কামরাঙা খেতে মজা , নবু মামারা সবাই এসময় ঘুমায় ,পুকুর থেকে লুকিয়ে মাছও ধরা যাবে ।

লোভ দেখিয়েও কাজ হয়না। সুজন তেমনি বিরসমুখে মাথা নাড়ায় ।
: উহু !
: যাবিনাহ ?
: না ।
: বাড়ি থেকে বকবে । তাছাড়া ..
: কি ?
সুজন উশখুশ করে। তারপর বলে ,
: এখন তেনারা ঘুরতে বেরোয়।
আবার তেনারা ? টুকলো বলে ,
: তেনারা কারা রে ?
: তেনারা হচ্ছে ভু ...থুড়ি ভরদুপুরে তেনাদের নাম নিতে নেই ।
: কেন নাম নিলে কি হয় ?
: সে বড় বিপদ হয় ।
: কি রকম বিপদ হয় ?
টুকলোর প্রশ্নে সুজন ভারি বিপাকে পড়ে। সেও অতকিছু জানেনা। মা ওকে বলেছে , তেনারা এসময় ঘুরতে বেরোয় তাই বেরোনো চলবেনা । ব্যাস এটুকুই সম্বল ।
সুজন চুপ করে থাকে। তাই দেখে টুকলো আবার বলে ,
: কিরে , কিরকম বিপদ বললি না যে ?
: সে আমি জানিনা ।
শেষমেশ অজ্ঞতা স্বীকার করতেই হয় সুজনের।
শুনে টুকলো বলে , ব্যাস ! এই যাচ্ছি । দেখি কি বিপদ হয়।
: যাসনে ! বিপদ হবে ।
: ছাই হবে !
টুকলো এক দৌড়ে সুজনদের বাড়ি পেরিয়ে কমলদের বাগানে ঢুকে পরে। কামরাঙাগুলো কেমন টকটকে লাল হয়ে আছে। উঁচু গাছটায় উঠে যেই ও একটা টকটকে কামরাঙা ধরে টান দিয়েছে , অমনি ধরাম !

সপ্তাহখানেকপর স্কুলে যাওয়ার পথে দেখা হয় টুকলো আর সুজনের ।
সুজন বলে , কি রে তোর নাকি পা ভেঙে গিয়েছিল ?
: হু !
: কিভাবে ভাঙল ?
: কামরাঙা পাড়তে গাছে উঠেছিলাম ,তেনারা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে ।
শুনে সুজনের বুকটা দু ইঞ্চি ফুলি যায়। সে এবার গম্ভীর হয়ে বলে ,
: দেখলিতো , বলেছিলাম না ? তেনারা বেজায় রাগী ।
: আবার ভালো তেনারাওতো আছে ।
: কোথায় ?
: ফোকলা দাদুর আলমারিতে ।তেনারাইতো আমার পা ঝেড়ে ঠিক করে দিলেন !
সুজনের চোখ বড় বড় হয়ে যায় ।
: তুই দেখেছিস ?
: দেখব কি করে ? লেঙচিয়ে বাড়ি ফিরতেই মা গিয়ে ফোকলা দাদুকে ডেকে নিয়ে এলেন। দাদু পা মুখে মন্ত্র পড়ে পায়ে ফুক দিয়ে বললেন , রাতে যখন ঘুমাবি তখন দেখবি পা ঠিক হয়ে গেছে ।সকালে আবার হাটতে পারবি।
আমি বললাম , তেনারা ঠিক করে দেবে বুঝি ? আলমারি থেকে বুঝি রাতে বেরোয় ?
দাদু হেসে বললেন , হ্যাঁ ।
আর তা শুনে মা কেন যেন , আঁচলে মুখ ঢেকে হেসে উঠলেন ।
স্কুল প্রায় এসেই পড়েছে । গেট পেরোতে পেরোতে এতখন টুকলোর কথা শুনছিলো সুজন ।
সে বলে , ও কিছুনা । ছেলে ভাল হয়ে যাবে শুনে সব মায়েরাই হাসে ।
টুকলোও সুজনের কথায় ঘাড় নেড়ে সায় দেয় ।

ফোরামে আছি ।