টপিক: মুর্শিদ

করিমের তখন বিপর্যস্ত অবস্থা। বাজার থেকে এক কেজি আলু আর দুসের চাল এনে যে হাড়িতে চড়াবে তার জো নেই। ছেলেটা দুটো টাকা চাচ্ছিল। কাঠের পুতুল নয় , ছেলে ভুলানো প্লাস্টিকের খেলনা ! তাও নয় । দুটাকায় আলাউদ্দিনের টঙ থেকে মুড়ি কিনে খাবে। করিমের পকেট একেবারেই খালি। আজকাল বাউল গানের দর নেই। আর বাউলগানের আসর তো সেই কবেই লাপাত্তা। করিমের অবশ্য গান বাঁধবার কমতি নেই। ঘরের দাওয়ার বসে ক্ষুধার্ত পেটে সে দিনরাত গান বাঁধে। তার ছেলেটা আছরে পড়ে কাঁদতে গিয়ে চোখ বড় বড় করে বাবার পাগলামো দেখে।
সেদিন জহুরুদ্দিন এসেছিলো গান শুনতে। করিমের অনেক আগের ভক্ত সে। তখন গ্রামে প্রতিবছরই নবান্নের সময় বসতো বাউলগানের আসর। নাসিরুদ্দিন ,ফজু মিয়া ছিল বাউলগানে নাম করা। করিমের বউটা তখনও মরেনি। সেই বউকে নিয়েই করিম বাঁধল এক গান। লোকের থালা ভর্তি করে চাউল দিল তাকে। সে দেখে করিম ভাবল , গানও হবে খাওয়া পড়ার চিন্তাও নাই ।
রুপজালালকে জন্ম দিতে গিয়ে বউটা গেল মরে। আর তার পরই যেন রাতারাতি গেল বোল পাল্টে। নতুন ইমাম এলেন মসজিদে। বললেন , গান মহা হারাম কাম । যে বান্দে হে হইল হারামি । মহা পাপী ।
গ্রামে সে বছর থেকে বাউল বন্ধ। লোকে ঝুলা ভরে চাউল দিয়ে আসে মসজিদে। ইমাম সাহেব দাড়ি নাড়ি হাসেন। বলেন , আল্লাহ আপনাগো হেদায়াত করছেন।
করিম গান ধরে ..
মন মজাইয়া রে
দিন ফুরাইয়া মুর্শিদ
কই লুকাইয়া গেলারে ..
মারফতি গান। জহুরুদ্দিন একমনে শুনে। দুদিনের অনাহারী করিমের গলায় এ সুর কোত্থেকে আসে বারান্দা বাঁশের পাল্লাটার পিঠ ঠেকিয়ে ভাবে সে ।
গান শেষ বলে , করিম ভাই , এমনে আর কয়দিন ? আমার লগে লও ঢাহা , বসরে কইয়া গার্মেন্টসে একটা কাজ লইয়া দিই।
করিম হাসে ! শুকনো হাসি । তারপর বলে , ঢাহা যাইতে কস? গান বাঁনব কেডা ? মুর্শিদের মন মজাইব কেডা ?হগলে তো ছাইড়া যায় । মুর্শিদ তো আমারে ছাড়েনা । আমারে ঘুমাইতে দেয়নারে জহুরুদ্দিন। গত গীত আইসা মনে বারি মারে ।
জহুরুদ্দিন শুনে রাগে। বলে , তাইলে কি করবা ? না খাইয়া মরবা ?
করিমের মুখে শুকনো হাসি । বুকে হাত পেতে বলে , আমার মুর্শিদই আমারে পথ দেখাইব। তিনার দুনিয়ায় তিনার খেলনা নিয়া তিনিই খেলুক ..
দরজার পাশ থেকে একতারাটা আবার তুলে নেই সে ।
তারপর আবার গান ধরে ,
পাঁচ পদে এই পৃথিবী
ও মুর্শিদ ..
বানাইয়া পাঠাইলা পুতুল
সে পুতুল নাচে ,হাসে , দিন কাঁটায়
ও মুর্শিদ , করে কতো ভুল ..
জহুরুদ্দিন একমনে শুনে যায়। ভাবে , লোকটা মরব । নির্ঘাত মরব !

সমাপ্ত

ফোরামে আছি ।