Share

টপিক: একটি সত্য ঘটনা

একটি সত্য ঘটনাঃ
আজ থেকে প্রায় একচল্লিশ বছর আগে একদা ’আল্লামাহ্ মুহাম্মাদ আহ্মাদ বা-শামীল (’হাফিযাহুল্লাহ্) লোহিত সাগর বুকে নৌকা সফর করছিলেন। নৌকাতে ছিলো আশি জনের বেশি আরোহী। হঠাৎ যখন তুফান শুরু হলো এবং নৌকাটি ডুবে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিলো তখন কবরপন্থীরা চিরঞ্জীব মহান শক্তিধর আল্লাহ্ তা’আলাকে না ডেকে হযরত সা’ঈদ্ বিন্ ’ঈসা (রাহিমাহুল্লাহ্) কে ডাকতে শুরু করলো। যিনি আজ থেকে প্রায় ছয় শত বছর অধিক কাল আগে মৃত্যু বরণ করেছেন। সবাই নিজ মনে এখান্ত ভয় ও আশা নিয়ে ডাকতে শুরু করলোঃ হে ইব্নু ’ঈসা! হে ইব্নু ’ঈসা! হে ধর্মের কাণ্ডারী! আপনি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করুন। সবাই সমস্বরে বলছেঃ আমরা সবাই আপনার নিকট এ মর্মে ওয়াদা করছি যে, আপনি যদি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করেন তা হলে আমরা আপনার কবরে এ মানত দেবো, সে মানত দেবো ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছিলো যে, তিনিই সবকিছুর মালিক এবং তিনিই সবকিছু করতে পারেন।
https://fbcdn-sphotos-f-a.akamaihd.net/hphotos-ak-ash3/598963_510831758975623_748365525_n.jpg

জনাব বা-শামীল সাহেব তখন অল্প বয়সের ছিলেন। তবুও তিনি তাদেরকে এ কথা বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, এ রকম কঠিন সময়ে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্যকে ডাকতে নেই। তিনি তাদেরকে বিনয়ের সাথে বললেন যে, তোমরা এখন বিনয়ের সাথে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাকেই ডাকো। শায়েখ ইব্নু ’ঈসাকে ডাকলে এখন আর কোন লাভ হবে না। তিনি তোমাদের ডাক শুনতে পান না এবং তাঁর হাতে কিছুই নেই। তাঁর এ নসীহত শুনে তারা অন্তত্য রেগে গেলো এবং তারা একযোগে বললোঃ ওয়াহাবী! ওয়াহাবী! তাদের অধিকাংশই সিন্ধান্ত নিলো বা-শামীলকে সাগরে ফেলে দিতে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছা ও কয়েকজনের বাধার সম্মুখে তারা আর তাঁকে ফেলতে পারলো না। যখন তুফান বন্ধ হলো এবং সবাই আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছায় বেঁচে গেলো তখন ওরা বা-শামীলকে এ বলে ধমকাতে শুরো করলোঃ আজ যদি ক্বুত্বব ইব্নু ’ঈসা উপস্থিত না হতেন তা হলে বাঁচা কোন ভাবেই সম্ভব হতো না। সবাই এক সময় মাছের পেটেই চলে যেতাম। তুমি আর এ জীবনে কখনো ওলীদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা করো না।
জনাব বা-শামীল সাহেব এ কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে বললেনঃ তোমরা মিথ্যা বলছো। শায়েখ ইব্নু ’ঈসা কারোর কথাই শুনতে পান না। তিনি আবার কিভাবে তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে সাগরের এ কঠিন ঢেউ ঠেলে তোমাদেরকে বাঁচাবেন। তিনি তো মৃত। আর আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ মৃতরা কিছুই শুনতে পায় না।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ
إِنَّكَ لاَ تُسْمِعُ الْمَوْتَى ، وَلاَ تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَآءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِيْنَ
অর্থাৎ মৃতকে তো তুমি কোন কথাই শুনাতে পারবে না। না বধিরকে পারবে কোন আহ্বান শুনাতে। যখন তারা পিঠ ফিরিয়ে চলে যায় তথা মৃত্যু বরণ করে। (আন-নাম্ল : ৮০)
আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেনঃ
وَمَا يَسْتَوِيْ الْأَحْيَآءُ وَلاَ الْأَمْوَاتُ ، إِنَّ اللهَ يُسْمِعُ مَنْ يَّشَآءُ ، وَمَآ أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَّنْ فِيْ الْقُبُوْرِ
অর্থাৎ জীবিত আর মৃত তো কখনো সমান হতে পারে না। নিশ্চই আল্লাহ্ তা’আলা যাকেই চান তাকেই শুনান। তুমি কবরবাসীকে কখনো কিছু শুনাতে পারবে না। (ফাত্বির : ২২)
কোন বিশেষ ব্যক্তি কবরে শুয়েও দুনিয়াবাসীর কথা শুনতে পান বলে কেউ দাবি করলে এর পক্ষে কুর’আন কিংবা হাদীসের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে হবে। কিন্তু এ পন্থীদের কেউ এ পর্যন্ত এ সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি। কিছুক্ষণের জন্য মেনে নিলাম, তাদের কেউ কেউ শুনতে পান তা হলে এ ধরনের কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে কি? যাতে আল্লাহ্ তা’আলা তাদের নিকট কোন কিছুর ফরিয়াদ করতে অনুমতি দিয়েছেন অথবা আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে সে ডাকে সাড়া দিয়ে উক্ত বিপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা দিয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত এ জাতীয় প্রশ্নের সন্তোষজনক কোন উত্তরই পাওয়া যাবে না।
জনাব বা-শামীল বললেনঃ বস্তুতঃ তোমরা কুর’আন-সুন্নাহ্ জানতে চাও না বলেই এ জাতীয় মূর্খতায় লিপ্ত হলে। যিনি সব কিছু শুনতে ও দেখতে পান তাঁকে বাদ দিয়ে যিনি কোন কিছুই শুনতে বা দেখতে পান না তাঁকেই ডাকতে পারলে।
জনাব বা-শামীল বললেনঃ আমাদের সবাই যে আজ তুফানের হাত থেকে বেঁচে গেলাম তা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার অনুগ্রহেই হয়েছে। তিনিই আমাদেরকে রক্ষা করেছেন। এতে ইব্নু ’ঈসার কোন হাত নেই। কারণ, তিনি তখন আমাদের সাথে ছিলেন না। তখন জনৈক কবরপন্থী বললোঃ আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করি, আল্লাহ্ তা’আলা সর্বশক্তিমান। তিনিই সবকিছু করতে পারেন। জনাব বা-শামীল বললেনঃ তোমরা মিথ্যা বলছোঃ আল্লাহ্ তা’আলার উপর যদি সত্যিই তোমাদের পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা থাকতো তা হলে তোমরা সদা চিরঞ্জীব মহান স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে কখনো মৃত সৃষ্টকে ডাকতে পারতে না।
ইতিমধ্যে আরেক ব্যক্তি বলে উঠলোঃ তোমরা তো ওলীদেরকে ঘৃণা করো। তাদের কোন কারামতই বিশ্বাস করো না। তাই তো আজ ইব্নু ’ঈসার কারামত খানা দেখতে পারলে না। জনাব বা-শামীল বললেনঃ আরে আমি তো কোন ওলীকে কখনোই ঘৃণা করিনি। তুমি কি দেখেছো, আমি কখনো কোন ওলীকে গালি দিয়েছি অথবা তাঁর কোন ধরনের সম্মান হনন করেছি। আর আমি তাঁদের কুর’আন-হাদীস স্বীকৃত কোন কারামতেও অবিশ্বাসী নই। আমি কি কখনো গিরিগুহায় আটক ব্যক্তিদের কারামত অস্বীকার করেছি? যা বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আমি কি কখনো হযরত আবু বকর, ’উমর, ’উসমান ও ’আলী এর বিলায়াত অবিশ্বাস করেছি। যাঁদের সম্পর্কে বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে, তাঁরা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত আল্লাহ্’র ওলী। বরং তোমরা তোমাদের মূর্খতার সাপোর্ট না দিলেই যে কাউকে এমন অপবাদ দিয়ে থাকো। যাক, এখন বলোঃ সে কারামত খানা কি? যা আমি দেখতে পাইনি। তখন সে বললোঃ আমি সা’ঈদ্ বিন্ ’ঈসাকে দেখতে পেলাম। তিনি নৌকার দাঁড় ধরে সাগরকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ হে সাগর! তুমি শান্ত হয়ে যাও। তখনই সাগর খানা শান্ত হয়ে গেছে। তাঁকে দেখে আমি যেন নূরের একটি ঝলক দেখলাম এবং তাঁর বরকতেই আমরা তুফান থেকে মুক্তি পেলাম।
জনাব বা-শামীল তাকে বললেনঃ তুমি কি কখনো হযরত সা’ঈদ্ বিন্ ’ঈসাকে দেখেছিলে? সে বললোঃ না, আমি কখনো তাঁকে দেখিনি। জনাব বা-শামীল বললেনঃ তা হলে তুমি কিভাবে বুঝতে পারলে তিনিই যে হযরত সা’ঈদ্ বিন্ ’ঈসা। তুমি যদি কোন কিছু দেখেই থাকো তা হলে তোমার নিকট কি আল্লাহ্ তা’আলা কোন ওহী পাঠিয়েছেন যে, ইনিই হলেন সে হযরত সা’ঈদ্ বিন্ ’ঈসা। তখন সে আর এর কোন উত্তর দিতে পারলো না।
তখন জনাব বা-শামীল সাহেব তাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথেই বললেনঃ বস্তুত তুমি সা’ঈদ্ বিন্ ’ঈসাকে দেখোনি, না আর অন্য কাউকে দেখেছো। বরং অত্যন্ত ভয়ের কারণে তুমি তখন চোখেমুখে শুধু অন্ধকারই দেখছিলে। আর তখন শয়তানও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলো। তখন তুমি মনে করেছিলে, হয়তো বা এই ইব্নু ’ঈসা। তখন তার উত্তর ছিলো যা সকল তাওহীদ বিদ্বেষীদেরই একমাত্র উত্তরঃ তুমি ওয়াহাবী, তুমি কাফির, তুমি বেয়াদব, তুমি গাদ্দার, তুমি ওলীদেরই শত্র“ ইত্যাদি ইত্যাদি।
উপরোক্ত ঘটনা থেকে এ কথা উপলব্ধি করা একেবারেই সহজ যে, বিপদের সময় আল্লাহ্ তা’আলার উপর মক্কার কাফির ও মুশ্রিকদের বিশ্বাস ও আস্থা অনেক অনেক বেশি ছিলো বর্তমান যুগের কবরপূজারী মুশ্রিকদের চাইতেও।
কেউ কেউ আবার বলতে পারেন, যারা বিপদের সময় ইব্নু ’ঈসা অথবা বাবা ভাণ্ডারী কিংবা বাবা শাহ্জালাল বলে ডাকেন তাদের পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার উপরই। তারা এমন বিশ্বাস করে না যে, ইব্নু ’ঈসা অথবা বাবা ভাণ্ডারী জলে বা স্থলে নৌকা কিংবা গাড়ী পরিচালনা করেন এবং তাদের সাথেই তাঁরা রয়েছেন। তাদের ডাক শুনেন এবং তাদের ডাকে সাড়া দেন যেমনিভাবে সাড়া দেন মহান আল্লাহ্ তা’আলা। বরং তারা এ কথা বিশ্বাস করে যে, একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই উপরোক্ত ওলীদের অসিলায় সে কঠিন মুহূর্তে তাদেরকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন। তবে এ মুহূর্তে তাদেরকে ডাকা হয় এ কারণেই যে, আল্লাহ্ তা’আলার নিকট তাদের এমন এক বিরাট সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে যার দিকে তাকিয়ে তথা তাদের সম্মান রক্ষার্থেই একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই তাদেরকে উক্ত বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।
উপরোক্ত কথা যারা বলে থাকেন তাদের কথা সবটুকুই মিথ্যা। কারণ, কোন বিবেকবান মানুষ এমন কাউকে কখনো ডাকেন না অথবা তার নিকট ফরিয়াদ করেন না যার ব্যাপারে তাঁর ধারণা সে কিছুই শুনতে পায় না এবং তাঁর ডাকে সে কখনো সাড়া দিবে না কিংবা সে তাঁর কোন লাভ বা ক্ষতির মালিকও নয়। বরং তাদের ডাকার ধরন ও মানতের ধরন দেখলে এ কথা সহজেই বিশ্বাস আসে যে, কবরপন্থীরা এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, তাদের ওলীরা সুখে-দুঃখে তাদের সাথেই আছেন। তাঁরা তাদের সকল ফরিয়াদ শুনেন এবং তাদের ডাকে সাড়া দেন। এমনকি তাদেরকে বিপদ থেকে নিজ হাতেই রক্ষা করেন। তাই তো তারা বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়ার পর তাদের মানতগুলো ঠিক ঠিকই পুরো করে থাকে। কারণ, তাদের বিশ্বাস তারা যদি ওয়াদাকৃত মানতগুলো ঠিক ঠিক পুরো না করে তা হলে ওরা অবশ্যই তাদের যে কোন ধরনের ক্ষতি সাধন করবে।