Share

টপিক: বাঁধনহারা

অনেক শাসন ও হুমকি ধামকির পর আশরাফ আলি চৌধুরী খোকার জন্য নিজের সাথে করে একজন মৌলীভি নিয়ে এলেন। অবাধ্য ছেলেকে বাধ্য ও জ্ঞানুরাগী করার ক্ষেত্রে এটি্ই ছিল সে সময়ের অভিভাবকদের জন্য সব থেকে ভালো ও সহজ উপায়। সেকালে দুরন্ত ইস্কুলগামী ছাত্রদের কাছে বাড়িতে মৌলভি আনা ছিল আতংকের বিষয়।
    ‘খোকা।’ পিতার বজ্রকন্ঠে দৌড়ে এলো পুত্র। ‘এ্ই হলেন হাবীবুল্লাহ খান। সালাম দাও।’
     লম্বা করে সালাম দিল খোকা। তাকে পড়াতে বাড়িতে মৌলভি রাখা হবে সে কল্পনাও করতে পারেনি।
     মাওলানা হাবীবুল্লাহ খান থাকবেন পূব পাড়ার নতুন মসজিদে। মসজিদে তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়াবেন ও মুসল্লিদের দ্বীনি শিক্ষা দেবেন। মাওলানা সাহেব ভারত থেকে মওলানা ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। এমন ভালো মাওলানার সম্মানীও না জানি কত! চৌধুরী পরিবাররে কোন কালেই শান শওকত কম ছিল না। তাই চারদিকে আশরাফ চৌধুরীর প্রশংসা ছড়িয়ে পরল। কিন্তু খোকার দল ব্যাপারটা একদম পছন্দ করতে পারল না। সামনের হপ্তা থেকেই মাওলানা সাহেব মাগরিব বাদ খোকাকে পড়াতে বাড়িতে আসবেন।
    সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ইস্কুলের নামে দুষ্টুমি। আর সূর্য একটু হেলে পড়লে মাঠে মাঠে গাছে গাছে নিত্য নতুন কৌশলে খেলা আবিষ্কারে খোকা ছিল সকলের নেতা। অনেক বাঘা বাঘা আর বয়সে বড় ছেলেরাও খোকার আনুগত্যে বিভিন্ন অপকর্ম সাধন করত। খোকা বাহিনীর ভয়ে এলাকার মানুষ থাকত তটস্থ। তাদের সরাসরি চৌধুরী বাড়িতে এসে আশরাফ চৌধুরীর কাছে নালিশ দেবার সাহস ছিল না। দু একজন যদিও ভুলে সে কাজ করে ফেলে দ্বিগুণ শাস্তি মাথা পেতে নিয়েছে। খোকা নিজে নিরাপদ আশ্রয় থেকে তার বাহিনী দ্বারা নালিশ দাতাদের উপর শাস্তি কার্যকর করিয়েছিল।

        আজ বিকেলে খোকা বাহিনী বনের ভেতর শেয়াল তাড়া করে চলছে। একটা বাচ্চা শেয়াল দেখে খোকা তার পোষা কুকুর কালা চাঁনকে নিয়ে অভিযানে নেমেছে। শেয়াল জঙ্গলের ভেতর নিজের গর্তে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু কালা চাঁনকে থামানো যায় না। সে গর্ত খুড়ে ঢুকে পড়তে চায়। কুচকুচে কালো বড় কুকুরটার গলা জাপটে ধরে অনেক চেষ্টায় খোকা তাকে শান্ত করল। খোকার সাঙ্গ পাঙ্গরা অপেক্ষা করছে নেতার আদেশর।
      শেয়ালের গর্তটা ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে দু মাথায় দুটো গর্ত খুঁজে পেল খোকা। ভেতরে একটা বড় শেয়ালও ঘাপটি মেরে আছে। হঠাৎ মাথায় একটা ভয়ংকর বুদ্ধি এলো তার।
‘যা বাড়িৎ থেকে কেরোসিন আন।’ জব্বারকে ডেকে বলল খোকা।
     মুহূর্তে ছেলেদের মাঝে হৈ হৈ পড়ে গেল। শেয়ালের গর্তের এক পাশের মুখ বন্ধ করতে হবে। হাত দিয়ে মাটি ও ইটের বড় বড় টুকরো জড়ো করতে থাকে এক একজন। কালা চাঁন মহা উৎসাহে চার পায়ে মাটি খুঁড়ে গর্ত বন্ধ করতে লেগে যায়। সবশেষে বড় একটা ইটদিয়ে গর্তের মুখটা ভালো করে বন্ধ করে দিল খোকা।
     এবার গর্তের অপর পাশে শুকনো গাছের ডাল ও পাতা জড়ো করা হল। জব্বার একটা হারিকেন নিয়ে এসেছে। হারিকেনের ভেতর থেকে কেরোসিন বের করে ডাল আর পাতায় আগুন জ্বালানো হল।
     ছেলেদের মুখ আনন্দে চক চক করছে। কারও কারও চেহারায় উৎকণ্ঠা। সবাই অল্প কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ চুপ। আগুনের তাপ এবং ধোঁয়া গর্তের ভেতর ঢুকছে। মুহূর্তে গর্তের ভেতর হুটোপুটি শুরু হয়ে গেল। ছেলেদের মাঝে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। নির্মমতার আনন্দ।
ছেলেরা শেয়ালগুলোকে নিয়ে হাসাহাসি আর কৌতুক করছে। অল্প কিছুক্ষণের জন্য খোকা বড় মা শেয়ালটাকে আগুনের ওপাশে দেখতে পেল। ওটার চোখে তার বাচ্ছাগুলোকে বাঁচানোর আকুতি।
     ‘গর্তটা খুলে দিতে হবে।’ আপন মনে বলল খোকা।
     ‘কেন?’ প্রতিবাদ করে উঠল কয়েকজন। এত তাড়াতাড়ি মজা শেষ হয়ে যাবে ভাবতে পারছে নাতারা। কোন বারণ শুনল না খোকা। সে কোন দিন কারও বারণ শোনেও নি। দৌড়ে গর্তের এক মুখ চাপা দিয়ে রাখা বড় ইটটা সরিয়ে দিল সে।
     অল্প একটু ফাঁকা জায়গা পেয়েই তার মাঝ থেকে প্রাণপণে একের পর এক শেয়াল বের হতে থাকল। চারটা বাচ্চার পর সবশেষে বের হল বড় মা শেয়াল। সবগুলোর পশম পুড়ে আলু সিদ্ধ অবস্থা। ছেলেরা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি করছে। কারও কারও হেঁচকি উঠে যাচ্ছে। মা শেয়ালের লেজের আগায় আগুন ধরে গেছে। তা নিয়েই সে বাচ্ছাদের পিছে দৌড় দিল। কালা চাঁন এতক্ষণ শান্ত ছিল। কিন্তু এবার সে তার স্বরে চিৎকার করে শেয়ালগুলোর পিছু নিল।
     ‘খুব শিক্ষা হইছে। আর মুরগী ধরবার আসবো না।’ খোকা তার হাসি থামাতে পারছে না। সবাই তার কথায় সম্মতি জানাল। কালাচাঁন শেয়াল গুলোকে ধাওয়া দিয়ে খালের ওপারে পাশের গ্রামে পাঠিয়ে দিল। এরপর থেকে এই শেয়াল পরিবারকে আর এ গ্রামে দেখা যায় নি।

       আজ মাগরিব বাদ মাওলানা সাহেব প্রথম খোকাকে পড়াতে বাড়িতে আসবেন। সকাল থেকে খোকার মন এ কারণে ভারাক্রান্ত। পাড়া মহল্লার জমায়েতগুলোতে মাওলানা সাহেবের ব্যাপারে যখনই সে আলোচনা হতে শুনেছে তখনই কান পেতে শুনেছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল এই মাওলানা ঠিক সময় মত নামাযের জানায়াত শুরু করেন। এক মিনিট এদিক ওদিক হয় না। সবাই ভেবেছিল প্রথমদিন ইমাম সাহেব আশরাফ চৌধুরী আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। কিন্তু তিনি তা না করে নামায শুরু করেন। চৌধুরী সাহেবকে এজন্য পিছনের কাতারে নামায আদায় করতে হয়। ব্যাপারটা প্রথমে তিনি অপছন্দ করলেও নামাযের পর সংক্ষিপ্ত বয়ানে ইমাম সাহেব বললেন, আল্লাহর ঘরে ধনী-গরীব সবাই সমান। এরপর তিনি শান্ত হলেন। নতুন মাওলানা সাহেবের সময়ানুবর্তীতায় সবাই খুশি। তার কারণে মুসল্লির সংখ্যা অনেক বেড়ে গেল। দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে মুসল্লিরা প্রথম জুম্মাবারে নতুন ইমাম সাহেবের বয়ান শুনতে এসে মুগ্ধ হল। যতই প্রশংসা শুনছে ততই খোকার তার হাত থেকে মুক্তির আশার আলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

      মাগরিবের বেশ কিছুক্ষণ পর মাওলানা হাবীবুল্লাহ খান এসে উপস্থিত। তাকে ডান দিকের বড় ঘরটায় নিয়ে যাওয়া হল। আগেই সি ঘরে তার জন্য গদি বসানো হয়েছে। খোকা ঘরে ঢুকে দেখল তার হুজুর বালিশে ভর দিয়ে আরাম করে বসে আছেন।
     ‘আস-সালামু আলাইকুম।’ সালাম দিল সে। গলার গভীর থেকে সালামের জবাব দিয়ে তার সামনে বসার নির্দেশ দিল মওলানা সাহেব। আসন গেড়ে বসতে গেল খোকা।
     ‘উহু।’ ডানে বামে মাথা নাড়াল মাওলানা। ‘ওস্তাদের সামনে বসার আদব আছে। নামাযের সুরুতে বস।’ তার আদেশ পালন করা হল।
    ‘এইবার বল তোমার নাম।’
    ‘খোকা।’
    ‘ইহা কেমন তর নাম।’ বিরক্ত হলেন মাওলানা। ‘ভালো নাম বল।’
    ‘আব্দুল্লাহ চৌধুরী।’
    ‘সুনু বাবা আব্দুল্লাহ। আমি শুধু তোমাকে পড়াইবও না, আদব লেহাজও শিক্ষা দিব।’
    ‘জি হুজুর।’ মাথা নেড়ে সায় দিল খোকা।
    ‘কোরআন দেখে পড়তে পার?’
    ‘জি।’
    ‘মাখরাজ হয় কিনা সেটাই বিষয়।’
    পড়া শুরু হল। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে মাওলানাকে লক্ষ্য করছে খোকা। মাওলানার দাড়ি অত্যন্ত কালো। দাড়ি এত কালো ও চকচকে বানালো কিভাবে এক সময় জেনে নিতে হবে। মাওলানার শরীর থেকে হাসনাহেনা ফুলের গন্ধ আসছে। প্রথম দিকে গন্ধটা মিষ্টি মনে হলেও যতই সময় যেতে লাগল তা যেন তিক্ত ও ঝাঁঝালো হয়ে খোকার নাকে লাগতে লাগল। যখন খোকা ভাবতে শুরু করল এ পড়া আর কোন দিন শেষ হবে না ঠিক তখন মাওলানা হাবীবুল্লাহ খান তাকে ছুটি দিয়ে দিল।
    ‘ইশার জামায়াত পড়াতে হবে। যাও আজ ছুটি।’ খোকার মনে হল ছুটি শব্দটি ওর কানে মধু ঝড়ালো।
    ‘আজ বেশিক্ষণ পড়াতে পারলাম না।’ যাবার সময় বললেন মাওলানা। ‘সামনে থেকে ভালো করে পড়াব।’
    আজ বেশিক্ষণ পড়ানো হয়নি তবে সামনে হাবে, ভাবতেই মাথা বোঁ বোঁ করে উঠল খোকার।
সকালে পাখির বাসা দেখতে দেখতে দেড় মাইল দূরের ইস্কুলে যাওয়া। ইস্কুলে ছেলেদের সাথে নানা দুষ্ট ফন্দি আটাঁ। বাড়ি ফিরে বড় ঝিলে সবার সাথে ডুবোডুবি আর সাঁতারের প্রতিযোগিতা। বিকেলে বনে বাদাড়ে মাঠে মাঠে ঘুড়ে বেড়ানো। এই হল খোকার প্রতিদিনের কাজ।এর মাঝে মাওলানা সাহেব তাকে সন্ধ্যার পর দু ঘণ্টা করে পড়ানো শুরু করেছেন। জীবনে খোকা দিনে দুঘণ্টা পড়েছে এ নজির নেই। তিন দিন মাওলানার কাছে পড়েই সে হাঁস ফাঁস করতে লাগল।

      খোকা আজ কিছুতেই মাওলানা সাহেবের কাছে পড়বে না। সে আর জব্বার জব্বারের বাড়িতে কেরাম খেলছে। এশার আজান হলে মাওলানা খোকাকে ছুটি দিয়ে নামায পড়াতে যান। তাই এশার আযান পর্যন্ত খোকা জব্বারের বাড়িতে থাকবে। পরে খোকা তার হুজুরকে কিছু বুঝিয়ে বলে দেবে। আজ জব্বারের কাছে কেরাম খেলায় হেরে গেলেও মুক্তির আনন্দে খোকা একটুও রাগ করে নি। অন্যদিন হলে তুঘলকি কান্ড ঘটিয়ে দিত। তাই জব্বারও খুব অবাক হল।
     এশার আযান শোনার পর অনেক সময় নিয়ে আস্তে ধীরে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল খোকা। ফুরফুরে মেজাজে বাড়িতে ঢুকল। ডান দিকের বড় ঘরের খালি গদি কল্পনা করে আপন মনে হাসল সে। কৌতূহল বশে সদিকে গেল। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল খোকার। তার হুজুর যথারীতি গদিতে আসীন!
    ‘ইয়া আল্লা’ এটুকুই বলতে পারল খোকা।
    ‘আব্দুল্লাহ, আস। ভেতরে আস।’ মাওলানা হাবীবুল্লাহ খানের মুখে বিজয়ীর হাসি।
    মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকল খোকা। গভীর রাত পর্যন্ত পড়ল মাওলানার কাছে। মাঝে ভেতর থেকে রাতের খাবার এলো। খোকাও খেল তার হুজুরের সাথে। আশ্চর্যের বিষয় দেরি হবার কারণ জানতে চাইলেন না মাওলানা সাহেব। খোকা বুঝল তিনি মিথ্যা শুনতে চান নি বলে কোন প্রশ্ন করেন নি।
    ‘হুজুর মসজিদে ইশার নামায কে পড়াইলো ?’ খাবার ফাঁকে জিজ্ঞাসা করল খোকা।
    ‘মুয়াজ্জিন সাবকে লোক মারফত সংবাদ পৌঁছান হইছে।’ মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছেন মাওলানা। খাওয়া শেষে তৃপ্তি সহকারে বললেন,‘আলহামদুল্লিলাহ।’ হতাশায় নুয়ে পড়ল খোকার মাথা।
    পরদিন খালার বাড়ি যাবার অযুহাতে গভীর রাতে ফিরল খোকা। তবে বাড়ি এসে দেখে হুজুর রাতের খাবার খেয়ে ঝিমুচ্ছে। সেদিনের মত কষ্ট কখন হয়নি খোকার। সারাদিনের ক্রমকাণ্ডের পর ক্লান্তিতে তার চোখ বুজে আসছিল। তবু মাওলানা সাহেব তাকে ছাড়ার পাত্র নয়। যখন খোকা দুচোখে অন্ধকার দেখছিল তখন তার ছুটি হল।
    ‘কাল মাগরিব বাদ পড়ব।’ মাওলানা উঠলে জড়ানো গলায় বলল খোকা।
    ‘দেখ তোমার পিতা তোমাকে পড়ানোর দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন। আমি তো হারাম খেতে পারিনি।’ মৃদু হেসে বললেন হাবীবুল্লাহ সাহেব।
    সারা বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। রাতে বিছানায় শুয়ে উপলব্ধি করল খোকা, সে যতই ফাঁকি দেবার চেষ্টা করুক না কেন তার হুজুর বিরাট নাছোড়বান্দা। তাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব না।
    ক্লান্তিতে চোখ বুজল খোকা।
    ইস্কুল এক মাসের জন্য ছুটি হয়ে গেছে। গ্রামের ছেলেরা এই একমাস বই খোলার কথা কল্পনাও করতে পারে না। সকাল হতে সন্ধ্যা বিভিন্ন খেলায় তারা ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু খোকার কথা আলাদা। তাকে মাওলানার কাছে পড়তে হবে। খোকার শোকে খোকা বাহিনীও কাতর।
    খোকা মাগরিবের পর মাওলানার জন্য অপেক্ষা করছে। এমন সময় খবর এল পাশের বাড়ির মনোয়ার চাচার অবস্থা যায় যায়। আশে পাশে সকল মানুষ মৃত্যুকালীন বিদায়ের জন্য উপস্থিত হয়েছে। খবর পেয়ে খোকাসহ খোকাদের বাড়ির সকলে ছুটে গেল।
    খোকা মনোয়ার চাচার চোউকির এক কোণায় দাঁড়াবার জায়গা করে নিল। ঘর ভর্তি মানুষ। পুরুষ মুরব্বীরা ঘরের ভেতর নিচু স্বরে কথা বলছে। মহিলারা এক নজর দেখে চলে যাচ্ছে। চৌকিতে মনোয়ার চাচা বসা; তার মুখ হা, চোখ বিস্ফোরিত। তাকে দুপাশ থেকে তার দুছেলে ধরে রেখেছে। হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে বের হওয়া ঘর ঘর শব্দ বেড়ে গেল মনোয়ার চাচার। 
      ‘ওয়ই শোয়া শোয়া শোয়া।’ আর্ত চিৎকার করে উঠলেন তিনি। তার দুই ছেলে তাকে ধরে চৌকিতে শুইয়ে দিল।
      ‘ওয়ই বয়া বয়া বয়া।’ আবার বুকের ব্যাথা বেড়ে গেলে চিৎকার করে উঠল মনোয়ার চাচা। আবার তার দুই ছেলে দুপাশ দিয়ে ধরে বসিয়ে দিল তাকে।
      আশেপাশের কথা থেকে বুঝা গেল এই শোয়ান-বসানো অনেকক্ষণ  ধরে চলছে। শ্বাস কষ্ট বেড়ে গেলে এভাবে তাকে আরাম দেবার চেষ্টা চলছে।
     সবাইকে অবাক করে হঠাৎ “শোয়া শোয়া” চিৎকার করে চৌকি থেকে ঘরের মেঝেতে গড়িয়ে নেমে পড়ল মনোয়ার চাচা। এভাবে আরও কিছুক্ষণ চলল। তারপর আর তাকে শোয়ানো থেকে বসানো গেল না। মারা গেলেন তিনি।
     মুহূর্তে মহিলাদের ভেতর নিচু স্বরে কান্না শুরু হল। মনোয়ার চাচার দুই পুত্র বধূ একই সুরে গানের মত করে বিলাপ করতে থাকে। তাদের স্বর অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে যায়। তবে মনোয়ার চাচা বেঁচে থাকতে তার দুই ছেলের বউ তার নামে সব থেকে বেশি কুৎসা ছড়িয়ে বেরিয়েছে।
    ঘরের পুরুষরা মুর্দাকে দাফন-কাফন আর জানাযার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। জানাযা হবে পূব পাড়ার মসজিদের এশার নামাযের পর। জানাযা শেষে দাফনের জন্য সবাই কবরস্থানে চলল। খোকা এসে দেখে অনেক টর্চ ও হারিকেনের আলোয় কবর খোড়া হচ্ছে। কবরস্থানের বিস্তৃতি কম না, খাল পাড় পর্যন্ত। মুর্দাকে এখনও মসজিদে রাখা হয়েছে। সবশেষে আনা হবে।
    খোকার সাথে তার কিছু সঙ্গী রয়েছে। খোকা অনির্দিষ্টভাবে টর্চ হাতে কবরের সারির ফাঁকে হাটাহাটি করছে। কবরের ইটের ফলকে মৃতের নাম,মৃত্যুর কারণ, তারিখ এগুলো পড়তে খোকার ভাল লাগে। একজনের নাম মুছে গেলেও মৃত্যুর কারণ যে কলেরা তা পড়া যাচ্ছে।
    “আমার ডর করতাছে।“ ভীত গলায় বলল টিংকু।
    “ক্যা? ভূতে ধরব?” মজা করে জিজ্ঞেস করল জব্বার।
    “হ তর কী।”
    বলে হাঁটা দিল টিংকু। খাটিয়ায় করে মসজিদ থেকে মুর্দাকে আনা হচ্ছে, দেখে আর দাঁড়াল না ওরা। কবর দেওয়া যখন শেষ পর্যায়ে তখন আকস্মিকভাবে খোকার মাথায় একটা বুদ্ধি চলে এল। দৌড় দিল সে।
     পরদিন সকালে খোকা তার বিশ্বস্ত তিন অনুচর জব্বার, হারেস এবং টিংকু নিজের প্লান খুলে বলল। জব্বার এক কথায় রাজি। হারেস একটু গড়িমসি করতে থাকে। খোকা বিনিময়ে তার ঘুড়ি আর লাটাই দিয়ে দেবার প্রলোভন দেখালে সে রাজি হয়।
     সমস্যাটা দেখা দিল টিংকুকে নিয়ে। সে কিছুতেই এত ভয়ংকর কাজ করতে পারবে না। পরে অনেক বুঝিয়ে তাকে সব থেকে সহজ কাজটা দেখালে সে রাজি হয়।
    বিকেল পর্যন্ত খোকার পরিকল্পনা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে যার যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল ওরা। অল্প কিছুক্ষণ পর গ্রামের বটতলায় আবার মিলিত হল। খোকা, জব্বার ও হারেসের প্রত্যেকের হাতে একটি করে চটের ব্যাগ। টিংকুর হাতে একটা চার ব্যাটারির শক্তিশালী টর্চ লাইট। আন্ধকারে পথ চলতে গ্রামে সবাই টর্চ ব্যবহার করে। তাই টিংকুকে কেউ সন্দেহ করবে না।
     “যা তুই রওনা দে।”খোকার নির্দেশ পেয়ে খুশি মনে মসজিদের দিকে রওনা দিল টিংকু।
      আলো আরেকটু কমে আসার জন্য অপেক্ষা করল খোকা। তারপর জব্বার আর হারেসকে নির্দেশ দিল তাকে অনুসরণের। ইটের রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আশেপাশে দেখে নিয়ে কবরস্থানে ঢুকে পড়ল খোকা। সেই নির্দিষ্ট কবরটার সামনে এসে দাঁড়াল ওরা তিনজন। যেটার এপিটাফে মৃত্যুর কারণ লেখা ‘কলেরা’।
     কবরস্থানের ভিতর বড় বড় গাছ। অন্ধকার এখানে আরও গভীর হয়ে জমাট বেঁধেছে। সকালে ওরা জায়গাটা দেখে গেছে। কিন্তু একন কেমন যেন অচেনা লাগছে।
    “কত দিনকার পুরানা কবর। যদি ভুত.....” কথা শেষ করতে পারল না হারেস।
    “চোপ একটা কথাও না।” জ্বলজ্বল করে উঠল খোকার চোখ।
    “নামবার পারবি?” খোকার গা ঘেঁষে এল জব্বার।
     জব্বারের প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না খোকা। কাজটা তাকে করতেই হবে। নিজের ব্যাগ থেকে টর্চ বের করে কবরটার উপর আলো ফেলল খোকা। কবরটার অর্ধেকের বেশি দেবে গেছে। পুরোটাই ঠসা।
    “সাপ খোপ নাই তো?” কাঁপা গলায় বলল হারেস। খোকার ধমক খেয়ে অনেকক্ষণ চুপ ছিল সে। বুঝা যাচ্ছে সে খানিকটা ভীত। অবশ্য এমন পরিবেশে অনেক সাহসী মানুষেরই বুকে কাঁপন ধরবে।
     হারেসের প্রশ্ন যুক্তিপূর্ণ হলেও কেউ তার জবাব দিল না। মসজিদ থেকে মাগরিবের আযান শোনা যাচ্ছে। আর দেরি করা যায় না। আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে কবরের ভেতর এক পা দিল খোকা। চাপ লাগতেই ঝুরঝুর করে ঢুকে গেল মাটি। সাবধানে পুরো শরীর ঢুকিয়ে দিল খোকা। কবরটা ওর বুক বরাবর গভীর। ভেতরটা ভালো করে দেখার জন্য আবার টর্চের আলো ফেলল খোকা। দুইটা ইঁদুর আর অনেকগুলো তেলাপোকা দেখতে পেল সে। হঠাৎ তীব্র আলো আর বাইরের আগন্তকের জন্য ওরা বিরক্ত।
     আলো যেন দূর থেকে দেখা না যায় সেজন্য টর্চের মাথায় গামছা জড়িয়ে নিল। যদিও গ্রামের বেশিভাগ লোকজন বিকেলের ভেতর কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়িতে থাকে। এর উপর ইটের রাস্তাটি কবরস্থানের পাশে হওয়ায় সন্ধ্যার পর এর ব্যবহারকারী সংখ্যা খুবই নগণ্য। মানুষ জন দিনের বেলায়ও আশেপাশে না তাকিয়ে যত দ্রুত সম্ভব এ পথটুকু অতিক্রম করে যায়। কবরস্থান শেষ হলে খালের পাড়ে এক কোনায় রয়েছে হিন্দুদের শ্মশান। কবরস্থানের থেকে শ্মশানের বেশি বদনাম রয়েছে। কিন্তু মসজিদ থেকে চৌধুরী বাড়ি যেতে ওই ইটের রাস্তাটি ব্যবহার করতে হয়।
     পা দুটি কবরের ভেতর ভালো জায়গা পেতেই খোকা তার ব্যাগ থেকে সরঞ্জাম বের করা শুরু করল। একটা কেরোসিন ভর্তি কাঁচের বোতল, ছোট একটা শুকনো ডাল ও ছেঁড়া কাপড়। সাথে আছে একটা দেয়াশলাই। কেরোসিনের বোতলটা খুলে কেরোসিনে কাপড়টা ভিজিয়ে ডালে জড়িয়ে নিল। এরপর বোতল, ডাল ও দেয়াশলাই কবরের সামনে সাজিয়ে রাখল।
     এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খোকার কাজ দেখছিল জব্বার এবং হারেস।
     “গাছে ওঠ।” খোকার নির্দেশ পেয়ে কবরের সামনে থাকা গাছটার উঁচু মোটা একটা ডালে চড়ে বসল ওরা দুইজন। ওদের দুইজনের ব্যাগ থেকে বের হল একটা করে শক্তিশালী টর্চ আর সাদা বিছানার চাদর। বড় চাদর দুটি দিয়ে মাথা সহ সারা শরীর ঢেকে নিল জব্বার ও হারেস। ওদের এক হাতে টর্চ ধরা। 
     “খবরদার কেউ আগে টর্চ জ্বালাবি না।” সাবধান করে দিল খোকা। সময় যত গড়াচ্ছে ওদের তিনজনের ভেতর উত্তেজনা তত বাড়ছে। চরম উত্তেজনায় খোকা গায়ে লাল পিঁপড়ে এবং তেলাপোকার কামড় অনুভব করছে না।
      চারদিকে ঘন আঁধার। আকাশে চাঁদ নেই। এখান থেকে ইটের রাস্তাটা বুঝা যায় তবে কোথাও জীবনের কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছে খোকা এক পুরোনো কবরের ভেতর।
     এমন সময় দূরে একটা টর্চ তিনবার জ্বলল ও নিভল।
     “আসতাছে।” রক্ত চলাচল বেড়ে গেল খোকার। গাছের উপর থেকে জব্বার এবং হারেস নিজেদের উপস্থিতি জানান দিল।
     দেয়াশলাই জ্বালিয়ে কেরোসিনে ভেজানো কাপড় জড়ানো ডালটায় আগুন ধরালো খোকা। ছোট একটা আগুনসহ ডালটা ওর বাম হাতে। ডান হাত দিয়ে কেরোসিনের কাঁচের বোতলটা মুখের সামনে ধরল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে বোতলে মুখ লাগিয়ে পুরো মুখ ভর্তি করে কেরোসিন নিয়ে নিল খোকা। এ কাজটা অনেক অভ্যাসের মাধ্যমে রপ্ত করেছে সে।
     এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, একটা টর্চের আলোর রেখা দুলতে দুলতে ইটের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। উপরে তাকিয়ে খোকা দেখল, জব্বার-হারেস গাছের যে মোটা ডালটার উপর এতক্ষণ বসে ছিল তার উপর তারা দাঁড়িয়ে গিয়েছে। ওদের আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢাকা। ওরা দুজনও ইটের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
     “এখনই।” চাপা স্বরে বলল জব্বার। বলতে না বলতেই আগের সেই টর্চ লাইটটি আবার জ্বলে নিভে গেল। সিগন্যাল দিচ্ছে টিংকু।
     শরীরের ভেতর বিদ্যুৎ খেলে গেল খোকার। হাতে থাকা আগুন লাগানো ডালটি মুখের সামনে ধরে মুখের ভেতর থাকা সম্পূর্ণ কেরোসিন উপরের দিকে কুলি করে ছুঁড়ে দিল খোকা। ডালের আগুন আর কেরোসিন একত্রিত হয়ে বিশাল এক প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা সৃস্টি করল।
     জব্বার ও হারেস তখনও গাছের ডালে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা চাদরের ঝুল তাদের পা ছাড়িয়ে আরও কিছুদূর নেমে গেছে। এবার তারা তাদের হাতে ধরা টর্চ শরীর বরাবর জ্বালালো। আটকে পড়া তীব্র আলো তাদের আকৃতিকে স্পষ্ট ও বিশালাকার করে তুলল। উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত সাদা চাদরে ঢাকা শরীর নিয়ে প্রথম জব্বার পরে হারেস খোকার জ্বালানো শিখার সামনে গাছ থেকে ঝাপ দিল।
       সব মিলিয়ে কবরস্থানের এই ভয়াবহ আলোকহীন পরিস্থিতিতে আগুনের প্রজ্বলিত অগ্নিতে দুই অশরীর আত্মাহূতি দূর থেকে দেখা যে কারও কাছে আতংকের বিষয়।
       কাজ শেষ হতেই খোকা কবর থেকে উঠে দৌড় দিল। তার দুই সহচর তাকে অনুসরণ করছে। দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা এসে বটতলায় থামল। বটতলায় পৌঁছে তিনজন আর হাসি থামাতে পারল না। খোকা প্রাণ খুলে হাসছে। মুক্তির হাসি।
     অল্প কিছুক্ষণ পর টর্চ হাতে দৌড়ে এল টিংকু।
     “হুজুরে মইরা যাইতেছে।” হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সে।
     “কস কী!” মুখ থেকে হাসি উবে গেল খোকার। দৌড়ে এসে খোকা দেখল ইটের রাস্তার উপর পূব পাড়ার মসজিদের ইমাম ও তার হুজুর মাওলানা হাবীবুল্লাহ খান অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। তার মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে। প্রচণ্ড আতংকে কাঁপছে সারা শরীর।
      সেদিন মাওলানা সাহেবকে মসজিদে পৌঁছে দিয়ে সেখানে আর এক মুহূর্ত থাকেনি খোকা। পরদিন সকালে খবরটা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল। কবরস্থানে দুইটা জ্বিন দেখা দিয়েছে। জ্বিন দুইটি তিন মানুষ সমান লম্বা। তারা আগুনের মাঝে ঝাঁপ দিয়েছে। কেউ কেউ বলল, দুইটা পরী মাওলানাকে তাদের দেশে নিয়ে যেতে এসেছিল। এভাবে ভূত-প্রেত-দেও-দানবের মধ্য দিয়ে গল্পের শাখা প্রশাখা বের হতে থাকল। ভয়ে গ্রামের মানুষ সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিল। গ্রাম বনধ দেবার জন্য টাউন থেকে বড় পীর আনার তোড়জোড় চলছে।
    কারও কারও কানে আসল ঘটনা পৌঁছাল। আশরাফ আলী চৌধুরী বেত হাতে খোকাকে সারা বাড়ি খুঁজলেন। কিন্তু সে ঘটনার রাতেই দীর্ঘ দিনের জন্য মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছে।
    মাওলানা হাবীবুল্লাহ খানের ঘটনার আকস্মিকতায় বমি হবার সাথে জ্বর এসেছিল। তবে তিনি দুই দিনের পরিচর্যায় সম্পূর্ণ সূস্থ হয়ে উঠলেন। আশরাফ চৌধুরীসহ গ্রামবাসী তাকে অনেক অনুরোধ করলেও তিনি আর থাকতে রাজি হলেন না। ঘটনার মূল নায়ক যে খোকা তা বার বার বলা সত্ত্বেও তিনি আশরাফ চৌধুরীকে না করে দিলেন।
    রেল এস্টেশনে এসেছে খোকা। চলে যাচ্ছেন মাওলানা হাবীবুল্লাহ খান। খোকা এতদিনে অনুধাবন করল লোকটাকে সে খুব পছন্দ করত। কিন্তু তার জীবন বাঁধনহীন। টিয়ে যেমন নিজের পা কেটে শৃঙ্খল মুক্ত হয় তেমনি খোকাও প্রবল অনুশাসন উপেক্ষা করে মুক্তি চেয়েছে।
   নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল খোকা। হাবীবুল্লাহ সাহেব হেসে তাকে বিদায় জানাল।